ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস
নিউইয়র্ক স্টেটের একটি বহুল আলোচিত মেডিকেইড হোম-কেয়ার কর্মসূচি ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে স্টেট প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট একটি বেসরকারি কোম্পানির পাবলিক পার্টনারশিপস এলএলসি (পিপিএল) বিরুদ্ধে মামলা করেছে ইউ এস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস। গত ১৬ জুন মঙ্গলবার ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের ফেডারেল কোর্টে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গভর্নর ক্যাথি হোচুলের প্রশাসনের অধীনে থাকা নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ একটি প্রায় ১০ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলারের হোম-কেয়ার প্রোগ্রামের দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করেছে এবং নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিকে সুবিধা দিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।
মামলায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে পাবলিক পার্টনারশিপস এলএলসি (পিপিএল) নামের জর্জিয়াভিত্তিক একটি কোম্পানির কথা, যেটি ২০২৫ সাল থেকে নিউইয়র্কের কনজিউমার ডাইরেক্টেড পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (সিডিপ্যাপ) পরিচালনা করছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখের কাছাকাছি প্রতিবন্ধী ও গুরুতর অসুস্থ মানুষ তাদের নিজস্ব কেয়ারগিভার নিয়োগ ও বেতন প্রদানের সুযোগ পান।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ একটি প্রি-সিলেক্টে বা আগে থেকেই নির্ধারিত কোম্পানিকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। এতে করদাতাদের অর্থ থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি ডলার লাভ করেছে পাবলিক পার্টনারশিপস এলএলসি (পিপিএল)। বিচার বিভাগের সিভিল ডিভিশনের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট এ. শুমেট এক বিবৃতিতে বলেন, নিউইয়র্কের এই ব্যর্থতা করদাতাদের কোটি কোটি ডলারের ক্ষতির কারণ হয়েছে এবং এটি জনগণের আস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একটি নির্দিষ্ট ভেন্ডরকে সুবিধা দিয়ে সরকারি অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক প্রশাসন পিপিএল কোম্পানির সাথে একটি ‘ব্যাকরুম ডিল’-এর মাধ্যমে চুক্তি করে এবং দরপত্র প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে এই কোম্পানিই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে এই কোম্পানি প্রোগ্রাম পরিচালনায় গুরুতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও রাজ্য প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
মামলায় নিউইয়র্ক স্টেটের স্বাস্থ্য কমিশনার জেমস ম্যাকডোনাল্ড এবং মেডিকেইড ডিরেক্টর আমির বাসিরি-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গভর্নর ক্যাথি হোচুলকে সরাসরি কোনো অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি। তবুও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, প্রশাসনিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গভর্নরের দপ্তরের প্রভাব ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অভ্যন্তরীণ ইমেইল আদান-প্রদানে দেখা যায় যে, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গভর্নরের দপ্তরের চাপ ছিল। মামলার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, পিপিএল কোম্পানি যখন সিডিপ্যাপ কর্মসূচির রূপান্তর কার্যক্রমের সময়সীমা তিন মাস থেকে নয় মাস বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, তখন নিউইয়র্ক প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে ২ লাখের বেশি রোগী ও কেয়ারগিভারদের সিস্টেমে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রোগ্রাম চালু হওয়ার এক সপ্তাহ পর দেখা যায়, প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র ৪৩ জন তাদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পেরেছেন। ফলে হাজার হাজার রোগী তাদের কেয়ারগিভারদের বেতন দিতে সমস্যার মুখে পড়েন এবং সেবা ব্যাহত হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ ইউএসসি ১২৪৫ কোড অনুযায়ী আদালতকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যাতে তারা আর কোনো ধরনের ফেডারেল স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতি চালাতে না পারে।
বিচার বিভাগের অভিযোগে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি সম্পর্কে স্টেট প্রশাসন জানলেও তারা জনগণের সামনে প্রকৃত অবস্থা গোপন করার চেষ্টা করেছে এবং প্রোগ্রামকে সফল দেখানোর জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ দাবি করেছে, এই অনিয়মের ফলে প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য অনুযায়ী করদাতাদের যে শত শত মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে হয়নি। বরং অতিরিক্ত ব্যয় ও অপচয়ের কারণে প্রোগ্রামের অর্থনৈতিক সুবিধা প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। বিচার বিভাগ আরও জানিয়েছে, পিপিএল কোম্পানি চুক্তির সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে এবং বিলিং রেট বাড়িয়ে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। মামলায় আদালতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের অনিয়ম বন্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়।
মামলায় জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট আদালতের কাছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিযুক্তদের ফেডারেল স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত কোনো ধরনের অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান বন্ধ করা এবং সিডপ্যাপ প্রোগ্রাম সম্পর্কিত যেকোনো প্রতারণামূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা। পাশাপাশি পাবলিক পার্টনারশিপস এলএলসি (পিপিএল)-এর ক্ষেত্রে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বিক্রি, স্থানান্তর বা ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোম্পানির সম্পদ পরিচালনার জন্য একজন রিসিভার নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে। আদালত প্রয়োজন মনে করলে অতিরিক্ত যেকোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলেও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, সিডপ্যাপ প্রোগ্রামটি নিউইয়র্কের হাজার হাজার অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হিসেবে বিবেচিত, যার মাধ্যমে রোগীরা নিজেরাই তাদের কেয়ারগিভার নির্বাচন করে স্বাধীনভাবে বাড়িতে বসবাসের সুযোগ পান। তবে মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রোগ্রামের পরিচালনায় অনিয়মের কারণে এর কার্যকারিতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পুরো ব্যবস্থার উপর প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক স্টেটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে মামলাটি ইতোমধ্যে স্টেটব্যাপী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলা শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ মেডিকেইড হোম-কেয়ার প্রোগ্রামের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এখন নজর থাকবে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যেখানে নির্ধারণ হবে এই বহুল আলোচিত ১০ বিলিয়ন ডলারের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। ফেডারেল আদালত এখন এই মামলার শুনানি করবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই মামলা নিউইয়র্কের মেডিকেইড ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং সিডপ্যাপ প্রোগ্রামের কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।