আল্টায় পাথরে খোদাই করা ৭ হাজার বছর আগের চিত্র
উত্তর ইউরোপের বিস্ময়কর দেশ নরওয়ের অনেক দূরের উত্তরে, আর্কটিক বৃত্তের কাছে একটি শহর আছে-আল্টা। এখানেই পাহাড়ি পাথরের গায়ে লুকিয়ে আছে মানুষের হাজার হাজার বছরের পুরোনো স্মৃতি।এই অসাধারণ প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকর্মকে বলা হয় Rock Art of Alta। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এখানে প্রায় ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার বছরের পুরোনো পাথরের খোদাইচিত্র পাওয়া গেছে। এগুলো মানুষের প্রাচীন জীবনযাপন, শিকার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের এক অসাধারণ দলিল। আল্টা অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজারের বেশি খোদাইচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এ চিত্রগুলোতে দেখা যায়, হরিণ শিকার করছে মানুষ। নৌকা নিয়ে সমুদ্রে যাচ্ছেন শিকারিরা। ভাল্লুক, হরিণ, তিমি এবং নানা প্রাণী। নৃত্য ও ধর্মীয় আচার। প্রতিটি চিত্র যেন সে সময়ের মানুষের জীবনযাপনের গল্প বলে।
ইতিহাসবিদদের মতে, এ অঞ্চল তখন ছিল শিকারি ও জেলেদের বাসস্থান। তারা পাথরের ওপর এ চিত্রগুলো খোদাই করতো হয়তো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা কোনো বিশেষ ঘটনার স্মৃতি হিসেবে। গ্রীষ্মের এক দীর্ঘ বিকেলে আমি আল্টার পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছালাম। চারদিকে পাইনগাছ আর নীরবতা। আমার সঙ্গে স্থানীয় গাইড-লিভ। তার চোখে উত্তরের আকাশের মতো স্বচ্ছ নীল আলো।
এ জায়গাটা আমাদের ইতিহাসের হৃদয়-সে বললো, আমরা ধীরে ধীরে পাথরের ওপর খোদাই করা ছবিগুলোর দিকে এগিয়ে যাই। লিভ একটি চিত্রের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো-দেখো, এখানে মানুষ হরিণ শিকার করছে। এ চিত্র প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরোনো। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে বললাম-এতো পুরোনো? অথচ এখনো কত স্পষ্ট! সে মৃদু হাসলো, কারণ এ গল্পগুলো মানুষের অস্তিত্বের গল্প।
একটি বড় পাথরের ওপর খোদাই করা একটি নৌকার ছবি দেখাল লিভ। এ নৌকাগুলো ব্যবহার করে মানুষ সমুদ্রে শিকার করতে যেতো-সে বললো।
আমি বললাম-তাহলে তারা খুব সাহসী ছিলো। লিভ একটু দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বললো-এ অঞ্চলে বাঁচতে হলে সাহসী হতেই হয়। তার কথায় যেন উত্তরের হিমেল বাতাসের দৃঢ়তা ছিল।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। দূরে ফিয়র্ডের জল ঝিলমিল করছে। আমি বললাম-এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সময় যেন অন্যরকম। লিভ মৃদু হেসে বললো-আল্টা মানুষকে সময়ের গভীরে নিয়ে যায়। আমি একটু মজা করে বললাম-তাহলে কি এখানে এসে মানুষ প্রেমেও পড়ে? সে হেসে বললো-হয়তো পড়ে। কারণ হাজার বছরের ইতিহাসের মাঝে দাঁড়ালে মানুষ নিজের হৃদয়টাও নতুন করে আবিষ্কার করে।
লিভ বলে, এ পাথরের খোদাইচিত্রগুলো শুধু শিল্প নয়, এগুলো মানবসভ্যতার প্রাচীনতম স্মৃতিগুলোর একটি। এ কারণেই ইউনেস্কো এগুলোকে সংরক্ষণ করার জন্য বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। আজ আল্টা বিশ্বের গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো আল্টার পাথরের গায়ে খোদাই করা ছবিগুলো যেন সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর। হাজার বছর আগে যারা এখানে বাস করতো-তাদের হাসি, সংগ্রাম, শিকার, বিশ্বাস-সবকিছুর প্রতিধ্বনি আজও এ পাহাড়ের মধ্যে বেঁচে আছে। আল্টা ছেড়ে যখন ফিরে আসি, মনে হচ্ছিলো মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার গল্প পাথরের গায়ে থেকে যায় হাজার বছর ধরে।