২২ জুলাই ২০১২, সোমবার, ০৭:৪৮:৩৭ অপরাহ্ন


যুক্তরাষ্ট্রকে সামলাতে ত্রিভুজ চাপ সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৬-০৬-২০২৪
যুক্তরাষ্ট্রকে সামলাতে ত্রিভুজ চাপ সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার জাতীয় পতাকা


ভূ-মধ্যসাগরে যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনের প্রভাব কমাতে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপানকে নিয়ে জোট গঠন ছাড়াও ওদের উদ্দেশ্য এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোকেও প্রভাব বলয়ে টেনে নেওয়া। অঞ্চলের অন্যতম দেশ বাংলাদেশের ওপর কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ সরকার ভারত, চীন, রাশিয়ার মতো দেশগুলোকে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হওয়ার সমান সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সামাল দিচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের অবদান কম নয়। তবে ইদানীং বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে চীনের অর্থনৈতিক সহায়তার দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্বল্প সময়ের ব্যাবধানে দুইবার ভারত সফর করেছেন। বিশেষ করে দুই দেশের জাতীয় নির্বাচনে নতুন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর উভয় সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ আলোচনা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের আগে এমন সফরের বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভারত বাংলাদেশ কনিটতম প্রতিবেশী। মুক্তিযুদ্ধের মূল সহায়তাকারী শুভাকাক্সক্ষী দেশ হিসেবে বিবেচিত। হাসিনা-মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কের কারণে অনেক বিষয়ে সমাধান মিললেও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীসমূহের পানি বণ্টন নিয়ে অগ্রগতি শূন্য। শুষ্ক মৌসুমে উজানে আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি তোয়াক্কা না করেই পানি অপসারণ করছে ভারত। বাংলাদেশের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত অনেক নদী এখন অস্তিত্বহীন। বাংলাদেশের অনেক এলাকা এখন মরুতে পরিণত। জলবায়ু পরিবর্তনের অশুভ ধারা সুস্পষ্ট। বর্ষার সময় নদীগুলো থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ায় বন্যায় ফসল, যানমাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের এ করুণ অবস্থায় নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে কালক্ষেপণ করেই চলেছে ভারত। ইদানীং চীন তিস্তা নদীর পানি সংরক্ষণে অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়ায় ভারত তিস্তা নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশ পশ্চিম থেকে পূর্বে যোগাযোগের জন্য জানালা খুলে দেওয়ায় ভারত সড়ক, রেল এবং জলপথে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পূর্বের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছে। মোংলা, চট্টগ্রাম বন্দরের পর মাতারবাড়ী গভীর সাগর ব্যবহার নিয়েও আলোচনা করছে। ভারতের কোম্পানি আদানি গ্রুপ তাদের ঝাড়খন্ড বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরাসরি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে বিদ্যুৎ রফতানি করছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল, ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ পাচ্ছে না। অনেকের মতে ভারতের প্রভাবে বাংলাদেশের কয়লা উত্তোলন, নিজস্ব গ্যাস আহরণ, উন্নয়ন ঝুলে আছে। ভারত থেকে পাইপলাইন দিয়ে তরল জ্বালানি আমদানি হচ্ছে। পাইপলাইন দিয়ে আর এলএনজি আমদানির তোড়জোড় চলছে। 

আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় দুই বন্ধুসুলভ প্রতিবেশীর মধ্যে মুক্তবাণিজ্য দোষের কিছু নেই। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি পণ্যসমূহের ওপর ট্যারিফ নন ট্যারিফ বাধা সৃষ্টি করে বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে পারছে না বাংলাদেশ। উপরোক্ত কারণে সাধারণ মানুষের মনে ভারত বিষয়ে সন্দেহ সংশয় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘ ১৬ বছর ভারত বন্ধু শেখ হাসিনা সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও ভারতের সঙ্গে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারছেন না।

অনেকেই জানেন ভারতের বাধার মুখে বাংলাদেশ সোনাদিয়া দ্বীপে চীনের সহায়তায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে সরে এসেছিল। পায়েরা বন্দর নির্মাণ এবং পায়েরায় চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে ব্যালান্স করতেই বাংলাদেশকে সুন্দরবনের স্পর্শকাতর এলাকায় ভারতের যৌথ বিনিয়োগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলতে হয়। মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ মাতারবাড়ী জ্বালানি বিদ্যুৎ হাব নির্মাণ কেন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল সেটিও অনেকের জানা। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজেও নানাভাবে জড়িয়ে পড়ে ভারত।

যা হোক ওপরের নানা পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দিয়ে বাংলাদেশ সরকার দেশের উন্নয়নে চীন, জাপান, ভারত, রাশিয়াকে সম্পৃক্ত রেখেছে। চীন বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মুক্ত থাকতে বাংলাদেশ সরকারকে চীন, ভারত, রাশিয়ার ত্রিভুজ প্রভাব সামাল দিতে হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের এই নীতি কতদিন ধরে রাখা যাবে সেটি এখন মিলিয়ন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার আছে প্রভাব মুক্ত বৈদেশিক নীতি বজায় রাখার।

শেয়ার করুন