কুয়াশার চাদরে ঢাকা বাংলাদেশে এখন তীব্র শীত। এরই মাঝে নানা সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে জাতীয় নির্বাচনের দিকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় বিএনপি জোট এবং জামায়াত জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই নির্ধারণ করবে দেশের অদূর ভবিষ্যতের শাসন ব্যবস্থা। নানা কারণে ২০২৬-২০৩০ বাংলাদেশকে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে হবে। অর্থনীতি সংকটে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক, প্রভাবশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক শীতল-এমনি পরিস্থিতিতে নতুন সরকারকে স্থায়িত্বের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
দেখতে দেখতে শেষ হয়ে আসছে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোনো কার্যকরি সংস্কার বা পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। সর্বক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থাপনা, নতুনভাবে সমতার ভিত্তিতে মেধাভিত্তিক এবং বৈষম্যবিরোধী সমাজ গড়ার অঙ্গীকারের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে সেটি দেশবাসী মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের অনুসন্ধানী পর্যালোচনায় দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি জুলাই আগস্ট ২০২৪র তুলনায় উন্নততর বলা যাবে না। ভঙ্গুর অর্থনীতি আরো দুর্বল হয়েছে, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গাছে, অর্থনীতিতে দুর্বৃত্তায়ণ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও সর্বক্ষেত্রে অস্থিরতার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদনে স্থিরতা আসেনি। বরং জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকার সমস্যা প্রকট হয়েছে। জুলাই আগস্ট ২০২৪ এবং পরবর্তী সময়ে থানা থেকে লুটকৃত অস্ত্র উদ্ধার হয় নি, সন্ত্রাসীসহ অনেক দণ্ডিত আসামি ছেড়ে দেওয়ায় দেশজুড়ে টার্গেট কিলিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সমাজ জীবনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে। কেবল পূর্ববর্তী সরকারের নেতা-নেত্রীদের তড়িঘড়ি করে বিচার করাই একমাত্র উদ্দেশ্য থাকায় বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব আদৌ উন্নত হয়নি। এমতাবস্থায় নির্বাচনে যে দল বা জোট জয়লাভ করুক বিদ্যমান বাস্তবতায় তাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রাধিকার ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নরূপ। সর্বস্তরে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ, ব্যবসা-বাণিজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিনিয়োগবান্ধব সুষ্ঠু নীতি প্রয়োগ নিশ্চিত করা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা সৃষ্টি। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকিং খাতে কিছুটা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার বা লোপাট হয়ে যাওয়া পাচারকৃত বিপুল অর্থ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। মহাদুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় বিপুল পরিমাণ কালোটাকা এখনো রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। নতুন সরকারকে নির্মোহভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে জেহাদ ঘোষণা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে আস্থা সৃষ্টির জন্য ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মেধাভিত্তিক জনবান্ধব প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর। বিগত সরকারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ থাকুক না কেন অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণে দেশ খাদ্যে অনেকটা স্বনির্ভর হয়ে উঠছিলো। সার, বীজ বিতরণ সুলভ এবং সহজতর হয়েছিল, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছিল। তবে বাজার ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কৃষকরা/উৎপাদকরা অথবা ব্যবহারকারীদের পরিবর্তে মধ্য স্বত্বভোগীরা লাভের গুড় খেয়ে ফেলেছে। নতুন সরকারকে আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে বাজারের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশ কিছু খাদ্যপণ্যের জন্য প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীল। কিছুটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কৃষি ব্যবস্থায় পণ্য বহুমুখী করণ এবং বিতরণ ব্যবস্থা সুসমীকরণ করলে বিদেশ নির্ভরতা কমানো যাবে। মৌসুমে অনেক অতিরিক্ত কৃষিপণ্য বিশেষত আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা-এমনকি আম, আনারস, কাঁঠাল সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। দেশব্যাপী আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করে এগুলো সংরক্ষণ করা হলে অপচয় রোধ হবে। উপকূল এলাকা এবং হাওর এলাকায় প্রতি বছর অনেক ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়। আধুনিক স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং সংরক্ষণ করা হলে বাংলাদেশ ৩-৫ বছরের মধ্যে খাদ্য এবং কৃষিপণ্যে প্রকৃতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে রফতানি করতে পারবে।
কৃষিজাত কাঁচামালের সহজপ্রাপ্তি এবং সুলভ শ্রমের কারণে বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের সোনালি সম্ভাবনা রয়েছে। একসময় জ্বালানি বিদ্যুতের সহজ এবং প্রাপ্তির কারণে কিছু শিল্প বিকাশে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি সাধন করেছিল। কিন্তু দুর্নীতি, অপশাসন বিশেষত জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অদূরদর্শিতা এবং অতিরিক্ত আমলা নির্ভরতার কারণে দেশে এখন জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনের তুলনায় অত্যাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (৩০ হাজার মেগাওয়াট+) অর্থনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিন্ডিকেট প্রভাবিত ভ্রান্তনীতির কারণে মাটির নিচে মূল্যবান আবিষ্কৃত কয়লাসম্পদ ফেলে রেখে এবং জলে স্থলে পেট্রোলিয়াম (গ্যাস, তেল) অনুসন্ধান না করে আমদানিকৃত জ্বালানির দিকে ছুটে বাংলাদেশ অসহনীয় জ্বালানি সংকটে পড়েছে। জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ লেনে বিরাজিত সংকট মোকাবিলা করা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। চাহিদা যখন সর্বোচ্চ ১৬০০০-১৭০০০ মেগাওয়াট সেখানে ৩০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক জ্বালানির সংকটে কোনো গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। বরং বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহকারীদের বকেয়া বিল পরিষদ করতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপুল পরিমাণ সাবসিডি দিয়েও সংকটের সমাধান হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা, এই সময় থেকেই নিবিড় সেচ মৌসুম শুরু হবে, মে মাস থেকে গ্রীষ্মকাল শুরু হবে। ২০২৫ গ্রীষ্মকালে খুব একটা গরম না পড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। এবার কিন্তু চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরু বিলম্বিত হয়েছে, এলএনজি আমদানির জন্য নতুন অবকাঠামো নির্মাণ আদৌ অগ্রগতি হয় নি। নিজস্ব জ্বালানি আহরণ এবং উন্নয়ন হয়েছে সীমিত। এমনকি আমদানিকৃত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়লা আমদানির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। এমতাবস্থায় ২০২৬ গ্রীষ্মকালের বিদ্যুৎ চাহিদা সামাল দেওয়া নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। কমপক্ষে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ-গ্যাস থেকে উৎপাদনের জন্য ১২২৫০-১৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস+এলএনজি সরবরাহ করতে হবে, অন্তত ৪৫০০-৫০০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। এর পরেও তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করার জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে হবে। জ্বালানি বিদ্যুৎ থেকে সাবসিডি তুলে নেওয়ার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের চাপ রয়েছে। সেক্ষেত্রে নতুন সরকারকে সুচিন্তিত কীভাবে জ্বালানি-বিদ্যুৎমূল্য সমন্বয় করতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতি সংকটে থাকবে, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি ব্যাহত হবে। আশা করি নতুন সরকার জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে সঠিক পেশাদারদের দায়িত্ব প্রদান করে স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলবে। ২০২৬, ২০২৭ কঠিন এবং নাজুক সময় পার করতে জাতীয় স্বার্থে সর্বদলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে সরকারের জন্য সঠিক কৌশল। আইন, বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশবিষয়ক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে পর্যায়ক্রমে লিখবো।