মিনেসোটার সেন্ট পল শহরের বাইরে একটি বাড়িতে অভিযান চালাতে প্রবেশ করছে আইসএজেন্টরা
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন দমন অভিযানের নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে। এর অংশ হিসেবে মিনেসোটার টুইন সিটিজ, মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল এলাকায় ৫ জানুয়ারি সুরমার থেকে প্রায় ২ হাজার ফেডারেল এজেন্ট ও কর্মকর্তার বিশাল মোতায়েন শুরু হয়েছে। একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই অভিযান অভিবাসন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত একটি বড় জালিয়াতি কেলেঙ্কারির তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস ) আওতাধীন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই)-এর শত শত এজেন্ট এতে অংশ নিচ্ছেন। কর্মকর্তারা জানান, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়ায় তারা নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই মোতায়েন অন্তত ৩০ দিনের ‘সার্জ অপারেশন’ হিসেবে পরিচালিত হবে। এটি হবে নতুন বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্প্রসারিত অভিবাসন অভিযানের প্রথম বড় লক্ষ্যবস্তু।
আইনশৃঙ্খলা সূত্র জানিয়েছে, এই অভিযানে আইস-এর এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড রিমুভাল অপারেশন্স (ইআরও) শাখার প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা এবং এইচএসআই-এর প্রায় ৬০০ এজেন্ট পর্যায়ক্রমে মিনিয়াপোলিস এলাকায় কাজ করবেন। অভিযানে বিশেষ কৌশলগত ইউনিটস্পেশাল রেসপন্স টিমস এবং বহু স্তরের কমান্ড কাঠামো যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ডজনখানেক উচ্চপদস্থ তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন। এই অভিযানের নেতৃত্বে থাকার জন্য মিনেসোটায় আসছেন ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন কমান্ডার গ্রেগরি বোভিনো, যিনি এর আগে লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, শার্লট ও নিউ অরলিন্সে বিতর্কিত অভিবাসন অভিযানের তত্ত্বাবধান করেছেন। তার সঙ্গে অজ্ঞাতসংখ্যক ইউএস বর্ডার প্যাট্রোল সদস্যও মোতায়েন করা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এক সাবেক ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তা এই মোতায়েনকে অসাধারণ মাত্রার বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, মিনিয়াপোলিসে পাঠানো এইচএসআই এজেন্টের সংখ্যা কার্যত অ্যারিজোনা স্টেটে নিযুক্ত পুরো এইচএসআই বাহিনীর সমান। তিনি বলেন, এটি বিশাল সম্পদ বরাদ্দ। মিনিয়াপোলিস এখন কার্যত নতুন শিকাগোতে পরিণত হচ্ছে ইঙ্গিত করে অতীতে ইলিনয়ে চালানো বড় পরিসরের ফেডারেল অভিযানের দিকে।এই অভিযানের পেছনে একটি বড় কারণ হলো মিনেসোটায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্ঘাটিত বহু বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল জালিয়াতি কেলেঙ্কারি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ফিডিং আওর ফিউচার মামলা, যা কোভিড মহামারির সময় ফেডারেল পুষ্টি কর্মসূচির অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে যুক্ত। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে মিনেসোটাভিত্তিক জালিয়াতি মামলায় ৯০ জনের বেশি অভিযুক্ত, যাদের মধ্যে ৬০ জনের বেশি ইতোমধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই জালিয়াতির অভিযোগগুলো শিশু যত্ন সহায়তা, হাউজিং স্ট্যাবিলাইজেশন ও পুষ্টি কর্মসূচিসহ একাধিক ফেডারেল প্রোগ্রামের সঙ্গে জড়িত এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই গত মাসে মিনিয়াপোলিস এলাকায় ডজনখানেক স্থানে এইচএসআইয়ের পরিদর্শন চালানো হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় এবার আরও বড় আকারের অভিযান শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে মিনিয়াপোলিস ও আশপাশের এলাকায় ফেডারেল তৎপরতা বেড়ে গেছে। এইচএসআই এজেন্টরা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন এবং আইস কর্মকর্তারা অভিবাসীবহুল এলাকায় গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছেন। এর ফলে প্রতিবাদ, উত্তেজনা ও ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে মিনেসোটার বৃহৎ সোমালি-আমেরিকান কমিউনিটির মধ্যে। উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সোমালিয়াকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তার গণ-নির্বাসন নীতির পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। গত মাসে তিনি সোমালি অভিবাসীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন, যা মানবাধিকার সংগঠন ও স্টেট নেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট গভর্নর টিম ওয়ালজ দাবি করেছেন, স্টেট সরকার জালিয়াতি দমনে নিষ্ক্রিয় ছিল না। তিনি অডিট, তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনা, প্রোগ্রাম ইন্টেগ্রিটি ডিরেক্টর নিয়োগ এবং একটি স্টেট ব্যাপী প্রতারণা প্রতিরোধ কাউন্সিল গঠনের কথা তুলে ধরেছেন। তবে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মধ্যেই ওয়ালজ ৫ জানুয়ারী, সোমবার ঘোষণা দেন, তিনি তৃতীয় মেয়াদে আর গভর্নর পদে নির্বাচন করবেন না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ মিনেসোটায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলারের শিশু যত্ন সহায়তার ফেডারেল অর্থ স্থগিত করেছে, জালিয়াতির অভিযোগ দেখিয়ে। রাজ্য নেতারা সতর্ক করেছেন, এই সিদ্ধান্ত ও বাড়তি ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা উপস্থিতি বৈধ ব্যবসা ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।সব মিলিয়ে, মিনিয়াপোলিসে প্রায় দুই হাজার ফেডারেল এজেন্টের এই মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি, ফেডারেল-স্টেট সম্পর্ক এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেদিকে এখন নজর আমেরিকানদের।