১৭ জানুয়ারী ২০২৬, শনিবার, ০১:২০:২৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ অনন্তকাল মনে রাখবে- নাগরিক শোক সভায় বক্তারা ইমাম নিহতের ঘটনায় টার্নারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ গঠন ম্যানহাটনে মুসলিম মহিলাকে ছুরিকাঘাত, আলবার্টকে ১১ বছরের কারাদণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নারী নিহত, প্রতিবাদে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ ট্রাম্পের কড়াকড়িতে অভিবাসী শ্রমিক কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শ্রমিকদের বেকারত্ব বেড়েছে ওয়াশিংটনের ন‍্যাশনাল প্রেসক্লাবে বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে সভা মধ্যবর্তী নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম বদলাতে মরিয়া ট্রাম্প জামায়াতের সাথে মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠক নিয়ে নানা গুঞ্জন এক বাসায় অনেক পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও ভাইরাল, ব্যবস্থা চায় বিএনপি বাংলাদেশ গাজার জন্য ট্রাম্প প্রস্তাবিত বাহিনীতে থাকতে চায়


বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ অনন্তকাল মনে রাখবে- নাগরিক শোক সভায় বক্তারা
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৬-০১-২০২৬
বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ অনন্তকাল মনে রাখবে- নাগরিক শোক সভায় বক্তারা


“বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ অনন্তকাল মনে রাখবে। কারণ, তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আজীবন লড়াই করেছেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপসহীন। দেশপ্রেমকে তিনি আজীবন লালন করেছেন। তিনি বলতেন, বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কিন্তু প্রভু নেই—দেশই আমার আসল ঠিকানা। এ কারণেই তার শেষযাত্রায় মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে তার নাম লেখা থাকবে”। এভাবেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসনকে নিয়ে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।


শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভায় এসব কথা বলেন তারা।



ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে বিএনপি বা বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের কেউ বক্তব্য রাখেননি।


সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের সভাপতিত্বে এ শোকসভার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ।


শুরুতে শোকগাথা পাঠ করেন নাগরিক শোকসভার সমন্বয়ক সালেহ উদ্দিন।




বিকাল ৩টায় শুরু হওয়া শোকসভায় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, লেখক, গবেষক, ধর্মীয় ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা অংশগ্রহণ করেন।


বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী ডা. জুবেইদা রহমান, তাদের সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শার্মিলা রহমান।


বক্তব্য রেখেছেন যারা


বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য রাখেন দৈনিক যায়যায়দিনের সম্পাদক, শফিক রেহমান, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) নূরুদ্দিন খান, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ডেইলি নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পক্ষে বিশপ সুব্রত বি গোমেজ, অর্থনীতিবিদ ও পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আইসিসিবি'র প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম ফায়েজ, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী।




এছাড়াও কূটনৈতিক আনোয়ার হাশিম, প্রয়াত খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক, নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি- বাসুদেব ধর, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, ব্রিটিশ আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী আইরিন খান, সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. রাশেদ আল তিতুমীর, ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ও ব্যবসায়ী সিমিন রহমান, বিপিকেএস'র সিইও এবং ডিপিআইর প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার দুলাল, লেখক ও চিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।


যা বললেন বক্তারা


অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ইসলাম বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া যখন ভুয়া মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন, তখন তার পক্ষে কেউ কথা বলেননি। তার বিচারটি ছিল অদ্ভুত ও জঘন্য। তখন এ নিয়ে বিবৃতি নিয়ে অনেক গণমাধ্যমে গিয়েছি। কিন্তু কেউ তা ছাপাতে সাহস করেননি। সময়ের ব্যবধানে একজন নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে। আরেকজন বিতাড়িত ভূমিতে। বেগম খালেদা জিয়া সৎ ও সাহসী ছিলেন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন তাকে ধারণ করতে হবে।”


জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, “আমরা একটি সংকটকালীন মুহূর্তে আছি। যেকোনোভাবেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন হয়। আমিও সেটা চাই। ভোটকেন্দ্রে সবাই যেতে হবে উৎসবমুখরভাবে। ভোটের পরিবেশ যেন বিঘ্নিত না হয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে।”



লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার সময়টাকে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। এক কঠিন মুহূর্তে রাজনৈতিক উত্থান পর্ব। তখন তিনি ছিলেন আপসহীন। সরকার গঠন। এই সময়ে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা আছে। আর ২০০৭ সাল থেকে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় দিতে হবে তিনি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী।”


দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, “ব্রিটিশ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত তিন জন জনপ্রিয় মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। এর মধ্যে ব্রিটিশ আমলে শেরেবাংলা ফজলুল হক, পাকিস্তান আমলে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া। একশ’ বছরের ইতিহাসে একই পরিবার থেকে স্বামী ও স্ত্রী একই সংসারে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। জিয়াউর রহমান সততার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে ইতিহাস অন্যরকম হতো। তার জানাজাও ঐতিহাসিক ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার বেলায়ও তা-ই হয়েছে। মৃত্যুকালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকলেও বেগম জিয়া ছিলেন ক্ষমতার বাইরে। তারপরও শেষ বিদায়ে মানুষের অজস্র ভালোবাসা পেয়েছেন। কারণ তিনি কোনোদিন মাথা নত করেননি।”


ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, “আমি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তার সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছি। তিনি উৎসাহিত করতেন। গণতন্ত্রে তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বিগত সরকার তাকে নানাভাবে নির্যাতন করেছে। এত কিছু করার পরও ৭ আগস্ট তিনি আমাদের যে বাণী দিয়েছেন তা তার উদারতার পরিচয় বহন করে। তিনি বলেছেন, ধ্বংস নয়। ভবিষ্যতের ভালোবাসা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার এই বাণীকে যেন আমরা লালন করি।”


লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, “বিএনপি বিশ বছর অত্যাচারের পরও জনগণের ভালোবাসায় টিকে রয়েছে। এর মূল কারণ বেগম জিয়ার দৃঢ়চেতা রাজনীতি।”


ব্যবসায়ী সিমিন রহমান বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া মানুষ হিসেবে আপসহীন ছিলেন। দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান ছিল। তিনি বলতেন, ব্যবসা করতে হবে নৈতিকতার সঙ্গে। আমার বাবা লতিফুর রহমানের কাছ থেকে শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়া সঠিকভাবে ব্যবসা করতে বলেছেন। তার জান্নাত কামনা করছি।”


অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে। শিল্পায়ন হয়েছে।”


ড. মাহবুবউল্লাহ বলেন, “মানুষ বেগম জিয়াকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। কারণ, দেশের জন্য তার ত্যাগ ও নিষ্ঠা অপরিসীম। তিনি এ দেশের মানুষ, গাছ, লতাপাতা ও পানি ভালোবাসতেন। বলতেন, দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। বিদেশে আমার কোনও ঠিকানা নেই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলেও তার আদর্শ চির অম্লান হোক। আল্লাহ আমাদের নেত্রীকে বেহেশত দান করুন।”


সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির বলেন, “বাংলাদেশ রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ধ্বংস নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার বিবেচনায় তিনি বিচক্ষণ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানাই।”


উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য রাখেননি তারেক রহমান


নাগরিক শোকসভায় শ্রোতাদের সারিতে স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য রাখেননি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়াও বিএনপির কোনও নেতাও বক্তব্য রাখেননি।




রাজনীতিবিদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যারা


শোকসভায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ, ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল উপস্থিত ছিলেন।


এছাড়াও যুগপতের শরিকদের মধ্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী।


ছিলেন না জামায়াত ও এনসিপিসহ ভিন্নমতের নেতারা


সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জামায়াতসহ অন্যান্য দলের নেতারা আমন্ত্রণ পেলেও বেগম খালেদা জিয়ার শোকসভায় তাদের কাউকে দেখা যায়নি। তবে এসব দলের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কিনা জানা যায়নি।


তবে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ ও মনির হায়দারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। 

শেয়ার করুন