০৩ জুন ২০২৬, বুধবার, ১০:২৭:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মাত্র এক ডোজেই কমতে পারে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত খারাপ কোলেস্টেরল নিউ ইয়র্কের ফোনমুক্ত স্কুলে কমেছে বুলিং আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রিনকার্ডের আবেদন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অপব্যাখ্যার পর পুনঃব্যাখ্যা, মামলার প্রস্তুতি বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারো বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা : দুইবারের বেশি দূতাবাসে যেতে হবে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড়রা এ প্রজন্মকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ : তারেক রহমানের ‘না’ সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত আশ্রয় আবেদন বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের


মুক্তিযুদ্ধে হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা বলে মূল্যায়ন
মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাবে জামায়াতে তোলপাড়
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৫-০৩-২০২৬
মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাবে জামায়াতে তোলপাড়


মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে চালানো হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে মূল্যায়নের মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাবের খবর রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় করছে। কেনো কি কারণে এধরনের বিষয়টি এখন আলোচনা আনা হচ্ছে তা নিয়ে জামায়াতেরও সর্ব পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে।

এখন দেখা যা খবরটি কি

বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে মূল্যায়ন করার একটি প্রস্তাব উঠেছে মার্কিন কংগ্রেসে। শুক্রবার (২০ মার্চ) পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে প্রস্তাবটি তোলেন ডেমোক্রিটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ‘হিন্দু অ্যাকশন’ নামের একটি সংস্থা। সেই অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় মার্কিন পার্লামেন্টে নতুন উঠল বলে জানান নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার দীলিপ নাথ।

ওহাইয়ো থেকে নির্বাচিএ আইনপ্রণেতা তার প্রস্তাবে বলেছেন, হত্যাযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঘোষিত অপারেশন সার্চলাইটের সময় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের ইসলামপন্থি সহযোগীরা নৃশংসতা চালায়। ওই সময় সব ধর্মের জাতিগত বাঙালিরা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। তখন হিন্দুদের নির্মূল করা হয়েছিল; তাদেরকে গণহত্যা করা হয়েছিল। এই প্রস্তাব তুলে ধরার সময় ল্যান্ডসম্যান বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ১৯৭১ সালের অভিযান জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা। এ অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগেই গণহত্যার তকমা দেওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ক্যাপিটল হিলে একটি শুনানি হয়। অবশ্য সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিসহ একাত্তরের গণহত্যার কথা উঠে আসে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্থান (বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা তখন পূর্ববঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মূলত পাঞ্জাবি পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ে গঠিত ছিল। তাঁরা দেশের সম্পদ ও উন্নয়নের সব প্রচেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। বলা হয় যে, নথিপত্রে প্রমাণিত যে পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রবল বাঙালি-বিদ্বেষ বিদ্যমান ছিল এবং তাঁরা বাঙালিদের নিচু জাতের মানুষ মনে করতেন। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ইশতেহার নিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সরকার গঠনের আলোচনা ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবন্দী করে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত “উগ্র ইসলামপন্থী” দলগুলোর সহায়তায়’ পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট নামে দমন অভিযান শুরু করে। অভিযানের আওতায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হত্যাকান্ড চালানো হয়। এ নৃশংসতায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান থাকলেও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত। দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এবং সামাজিক গ্লানির কারণে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত কখনো জানা যাবে না ও ভুক্তভোগীদের নাম স্মরণ করা হবে না।

বাংলাদেশে কি হতে পারে

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে চালানো হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে মূল্যায়নের মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাবের খবর বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অনেক বেশি আসন পেয়ে প্রধান বিরোদী দলের আসনে আসীন। তারা প্রচার করে যাচ্ছে দলটি আরও বেশি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসতে পারতো। তাদেরকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তোলপাড় করা হচ্ছে শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে দলটির পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে দলটি আন্তর্জাতিক লবিও অনেক শক্তিশালি। দাবি করা হচ্ছে পশ্চিমারা এখন জামায়াতে ইসলামী নামের দলকে মডারেট ইসলামী দল বলে বিবেচনা করে। কারো কারো মতে, রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটি যখন এখন এমন শক্ত অবস্থানের জানান দিচ্ছে, ঠিক তখন আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে চালানো হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে মূল্যায়নের মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাবের খবরটি বেশ গুরুত্ব বহণ করে। আর বিষয়টি আরও গুরুদ্বপূর্ণ যখন হত্যাযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তাবও রাখা হয়।

এদিকে ১৯৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে সংঘটিত ‘গণহত্যা’র স্বীকৃতির দাবিতে গত ২০ মার্চ মার্কিন প্রতিনিধি সভার ১১৯তম কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে ধর্মীয় বৈষম্যবিরোধী মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত এক প্রেস বিবৃতিতে প্রস্তাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার যে আহ্বান জানানো হয়েছে তাকে ‘যথার্থ’ বলেও উল্লে¬খ করা হয়।

ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এক বিবৃতিতে গভীর দুঃখের সাথে আরো বলা হয়, স্বাধীনতা-উত্তর বিগত ৫৪ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের মতো একই কায়দায় নানান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং আদিবাসী সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ইত্যাদি একনাগারে নির্বিবাদে অব্যাহত রাখায় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর হার ৭০-এর ১৯.০৭% থেকে বর্তমানে ৯.০২% এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কারো শাস্তি এ পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয় নি। এদের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকায় সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তের দল অধিকতর উৎসাহিত হয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকার কর্তৃক পরিপুুষ্ট হয়েছে এবং তাদের ঘৃণ্য কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সুযোগের সন্ধানে আজো তারা তৎপর। এমনি এক পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের স্বকীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রত্যয়ে অনতিবিলম্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠনসহ ৮ দফা দাবি বেশ কয়েক বছর ধরে নানান সরকারের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে এবং এরই বাস্তবায়নে নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক পন্থায় ধর্মীয় বৈষম্যবিরোধী মানবাধিকারের আন্দোলনকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে নিতে ঐক্য পরিষদ সচেষ্ট।

শেয়ার করুন