০২ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০২:১৩:৩১ পূর্বাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-৪
ওমানের ল্যান্ড অব ফ্রাংকিনসেন্স
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-০৪-২০২৬
ওমানের ল্যান্ড অব ফ্রাংকিনসেন্স ওমানের ধূপ গাছে


ভোরে ওমানের সালালাহ সিটির হামদান প্লাজা হোটেলের লবিতে যখন অপেক্ষা করছি, একটা ধবধবে সাদা ফোর-হুইলার জিপ এসে থামলো। ড্রাইভিং সিট থেকে নামলো এক তরুণী। কালো আবায়া (ওমানি নারীদের পোশাক) আর মাথায় রঙিন স্কার্ফ জড়ানো, চোখে গাঢ় সুরমা। হাত বাড়িয়ে বললো, আমি লায়লা। আজ তোমার ‘ল্যান্ড অব ফ্রাংকিনসেন্স’ ঘুরার গাইড।

লায়লার আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি আর চনমনে ব্যক্তিত্ব আমাকে শুরুতেই মুগ্ধ করলো। গাড়ি ছুটলো শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে। জানালার বাইরে তখন রুক্ষ পাহাড় আর মাইলের পর মাইল ধূসর মরুভূমি। ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগলো দৃশ্য-সবুজের জায়গা নিলো শুষ্ক পাহাড়, তারপর কোথাও কোথাও লোবান গাছের ছড়াছড়ি। লায়লা জানালো, এ গাছ থেকেই বের হয় ফ্যাংকিনসেন্স। একসময় যা ছিল সোনার চেয়েও দামি।

আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, তাহলে এ পথগুলো একসময় সুবাসে ভরে থাকতো? লায়লা মৃদু হেসে বললো, হয়তো এখনো আছে, শুধু অনুভব করার মতো মন চাই। লায়লা জানালো, আমাদের প্রথম গন্তব্য ওয়াদি দাওকা। এটি ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি বিশাল প্রাকৃতিক ধূপ বাগান। গাড়ি থেকে নামতেই তপ্ত বাতাস গায়ে লাগলো। চারদিকে গিঁট পাকানো, ধূসর, ঝোপালো সব গাছ। দেখতে খুব আহামরি কিছু নয়।

লায়লা একটা গাছের কাছে গিয়ে থামলো। পকেট থেকে একটা ছোট ছুরি বের করে গাছের বাঁকলে হালকা আঁচড় কাটলো। অবাক হয়ে দেখলাম, সে ক্ষতস্থান থেকে দুধের মতো সাদা আঠা বেরিয়ে আসছে। লায়লা বললো, এটাই মরুভূমির মুক্তো। এ আঠা শুকিয়ে শক্ত হলেই তৈরি হয় বিশ্বের সেরা ধূপ ‘হোজারি’। দুই হাজার বছর ধরে এ গাছগুলো এভাবেই বুক চিরে সুগন্ধ বিলিয়ে আসছে।

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। রোদ চড়ছে। রোদের তাপে বাতাসে একটা হালকা, মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। আমি আলতো করে একটা গাছের ডাল ছুঁইলাম। লায়লা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো, এ গাছগুলোর খুব ধৈর্য। বছরের পর বছর রুক্ষ প্রকৃতিতে বেঁচে থাকে, ঠিক খাঁটি ভালোবাসার মতো। যত ঝড়-তুফান আসুক, সুগন্ধ হারায় না।

ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, তোমার এ ধূপের দেশের গল্পগুলো তো ধূপের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়, লায়লা। সে উত্তর দিলো না। শুধু ওর স্কার্ফের আড়াল থেকে একচিলতে হাসি আছড়ে পড়লো মরুভূমির বুকে। দুপুরের রোদ যখন মাথার ওপর, আমরা পৌঁছলাম সুমহুরাম বা খোর রোরি। এটি একটি প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, যা একসময় ধূপ বাণিজ্যের প্রধান বন্দর ছিল। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে দেওয়ালগুলো আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে সে সোনালি অতীতের।

আমরা ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম। লায়লা বলতে থাকলো কীভাবে প্রাচীন মিশরের রানি শেবা এখান থেকে ধূপ নিয়ে যেতেন। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি বললাম, এখানে দাঁড়ালে মনে হয় সময় থমকে গেছে। লায়লা সাগরের দিকে তাকিয়ে বললো, সময় থামে না। শুধু স্মৃতিগুলো এ পাথরের মতো থেকে যায়। আমি ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মরুভূমির হাওয়ায় লায়লার আবায়া উড়ে আমার গায়ে লাগছিল। আমি বললাম, তোমার সঙ্গে কাটানো এ সময়টা আমার কাছে একটা সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে। 

লায়লা এবার আমার দিকে তাকালো। ওর গভীর চোখে তখন বিকালের রোদের আভা। ও হালকা স্বরে বললো, স্মৃতিরা দামি, যদি তা সঠিক মানুষের সঙ্গে তৈরি হয়। এতক্ষণ ঘোরাঘুরিতে পেটে তখন খিদে চনচন করছে। লায়লাকে বলতেই সে আমাকে নিয়ে গেল শহরের এক পুরোনো ধাঁচের ওমানি রেস্তোরাঁয়। ভেতরে কার্পেট বিছানো, নিচু টেবিল। আমরা জুতো খুলে বসলাম।

লায়লা অর্ডার দিলো। কিছুক্ষণ পরেই টেবিলে এলো বিশাল থালা। তাতে সুগন্ধি জাফরান দেওয়া ভাত আর তার ওপর মসলায় জড়ানো আস্ত একটা ভাজা মাছ-ওমানিদের প্রিয় ‘মাশওয়াই’। সঙ্গে এলো ওমানি হালুয়া আর টাটকা খেজুর। হাত ধুয়ে নাও। ওমানে আমরা হাতে খেতেই পছন্দ করি-লায়লা বললো। খাবারের স্বাদ ছিল অতুলনীয়। মাছের ওপর লেবুর রস চিপে দিতে দিতে লায়লা গল্প করছিল ওমানি সংস্কৃতির। ওর আন্তরিকতায় খাবারের স্বাদ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। খাওয়া শেষে এলো ওমানি ‘কাহওয়া’ (ছোট কাপে এলাচ দেওয়া কফি)।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পালা। আমরা গেলাম সালালাহর বিখ্যাত ‘আল হাফাহ’ বিচের ধারের এক ছিমছাম ক্যাফেতে। বাইরে সমুদ্রের গর্জন, ভেতরে হালকা গান। ক্যাফের প্রতিটি টেবিলে ছোট মাটির ধূপদানিতে ধূপ জ্বলছে। নীলচে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশে।

আমরা জানলার ধারের টেবিলটাতে বসলাম। এবার কাহওয়া। সঙ্গে মিষ্টি খেজুর। তোমার এ শহরটা ছাড়তে খুব কষ্ট হবে-আমি বললাম। লায়লা ওর কফির কাপে চুমুক দিয়ে জানলার বাইরে সাগরের দিকে তাকালো।

বললো, শহর না কি শহরের স্মৃতি? আমি ওর হাতের ওপর আমার হাতটা আলতো করে রেখে বললাম, দুটোই। আর এ স্মৃতির সবচেয়ে সুন্দর অংশটা তো তুমি। লায়লা হাতটা সরিয়ে নিলো না। শুধু ওর ঠোঁটের কোণে একটা মায়াবী হাসি ফুটে উঠলো। সমুদ্রের বাতিঘরের আলো তখন ওর মুখে এসে পড়ছে। সে মুহূর্তে মনে হলো, আরব্য রজনীর কোনো এক রাজকন্যার সামনে বসে আছি।

রাত বাড়ছে। এবার ফেরার পালা। লায়লা গাড়ি চালাচ্ছিল। শহরের আলো কমে আসছে। দুপাশে মরুভূমির নীরবতা। গাড়ির ভেতরেও অদ্ভুত নিঃশব্দ। লায়লা হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে ওর ব্যাগ থেকে একটা ছোট মখমলের থলি বের করলো। আমার হাতে দিয়ে বললো, এটা তোমার জন্য। এর ভেতরে ওয়াদি দাওকার সবচেয়ে সেরা হোজারি ধূপ আছে। আমি থলিটা খুলে দেখলাম, ছোট ছোট স্ফটিকের মতো ধূপের দানা। হাত দিতেই আঙুলে সেই মিষ্টি ঘ্রাণ লেগে গেল।

আমি বললাম, ধন্যবাদ লায়লা। তবে সবচেয়ে দামি উপহার তুমি আজ আমাকে যা দিলে, তাহলো তোমার সময়, তোমার গল্প। লায়লা হোটেলের সামনে গাড়ি থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ভুলে যাবে না এ ধূপের সুবাস। যখনই এ গন্ধ পাবে মনে করবে ওমানের মরুভূমিতে কেউ তোমার পথ চেয়ে আছে। আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। লায়লার গাড়িটা অন্ধকারে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইলাম। বাতাসে তখনো সেই মাদকতাময় ধূপের গন্ধ। আমার হাতের তালুতে সেই ঘ্রাণ যেন লেগে আছে। ওমানের সেই মরুভূমি, প্রাচীন দুর্গ আর লায়লার সুরমা আঁকা চোখ-সব মিলিয়ে এ দিনটা এক অপার্থিব গল্প হয়ে থেকে যাবে আমার জীবন পাতায়।

মনে হচ্ছিলো, ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা দেখা নয়, কখনো কখনো কারো চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া। আর সেই প্রতিচ্ছবি, অনেকটা ফ্রাঙ্কিনসেন্সের সুবাসের মতো-নীরব, গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।

শেয়ার করুন