২৭ মে ২০২৬, বুধবার, ১১:০০:৪৩ অপরাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-৯
হারানো সভ্যতার দরজায়
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
হারানো সভ্যতার দরজায় কাল’আত আল-বাহরাইন দুর্গ


বাহরাইনের সকালটা আজ অন্যরকম। উপসাগরীয় বাতাসে লবণের গন্ধ আর আকাশে তখনো পুরোপুরি রোদ ফোটেনি। হোটেল থেকে বের হলাম সাড়ে ৮টায়। মানামার ব্যস্ত শেখ খলিফা হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটছে উত্তরের দিকে। গন্তব্য কাল’আত আল-বাহরাইন। ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। ৪ হাজার বছরের পুরোনো দিলমুন সভ্যতার রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ।

রাস্তার দুপাশে খেজুর গাছের সারি। দূরে চকচকে আধুনিক বাহরাইনের আকাশচুম্বী অট্টালিকা। কিন্তু আমরা যাচ্ছি ইতিহাসের আরো গভীরে। গাড়ি এসে থামলো যখন, ঘড়িতে ৯টা বাজে। পার্কিং থেকে নেমেই দেখলাম, সামনে এক তরুণী দাঁড়িয়ে। গায়ে হালকা নীল আবায়া, মাথায় সাদা হিজাব, হাতে একটি ফোল্ডার।

চোখে কাজলের রেখা, ঠোঁটে মৃদু হাসি। ‘আসসালামু আলাইকুম। আমি লায়লা আল-মানসুর, আজকের জন্য তোমার গাইড।’ লায়লার দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম, ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম। আমি এসেছি নিউ ইয়র্ক থেকে। দিলমুনের কথা বইয়ে পড়েছিলাম, আজ চোখে দেখতে এলাম।’

লায়লা হাসলো। পাথরের পথ ধরে আমরা দুজন সামনে এগিয়ে গেলাম। দুর্গের মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে লায়লা শুরু করলো তার বর্ণনা। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছি, আর মাঝে মাঝে পাথরের দেওয়ালে হাত বোলাচ্ছি।

‘দিলমুন’, লায়লা বললো, শুধু একটি জায়গার নাম নয়। এটি একটি স্বপ্নের নাম। সুমেরীয় পুরাণে দিলমুনকে বলা হতো ‘পবিত্র ভূমি’, যেখানে মৃত্যু নেই, রোগ নেই, বার্ধক্য নেই। কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন এটিই ছিল বাইবেলের গার্ডেন অব ইডেন।

খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার অব্দ থেকে দিলমুন সভ্যতার বিকাশ শুরু। এ ভূমি ছিল তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। মেসোপটেমিয়া (আজকের ইরাক) থেকে তামা আসতো, সিন্ধু উপত্যকা (আজকের পাকিস্তান-ভারত) থেকে আসতো মূল্যবান পাথর ও হাতির দাঁত। দিলমুন ছিল সে দুই মহাসভ্যতার মধ্যে সেতু।

ভাবো, লায়লা বললো। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো তার, যখন পিরামিড তৈরি হচ্ছিল মিশরে, তখন এখানে বসে ব্যবসায়ীরা সোনার হিসাব করতেন। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার অব্দে দিলমুনের সোনালি যুগ। তখন এখানকার বন্দর থেকে জাহাজ যেত ওমান, ইয়েমেন, ভারত পর্যন্ত। সুমেরীয় লেখায় পাওয়া গেছে, দিলমুনের বণিকরা রুপার বিনিময়ে তামা কেনে। এরপর আসে কাসাইট শাসন, তারপর অ্যাসিরীয়, তারপর পারসীয়। প্রতিটি সভ্যতা এ মাটিতে তাদের ছাপ রেখে গেছে। সে স্তরগুলো এখনো মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে।

এ দুর্গটি, লায়লা দুর্গের দিকে ইশারা করলো। পর্তুগিজরা ষোড়শ শতাব্দীতে পুনর্র্নির্মাণ করেছিল। কিন্তু নিচের মাটি খুঁড়লে পাওয়া যায় দিলমুনের আসল ইট। আমরা ঢুকলাম দুর্গের প্রাচীরের ভেতরে। পাথরের সরু গলিপথ, দুপাশে ভাঙা দেওয়াল। কোথাও কোথাও এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্তম্ভের ভগ্নাংশ। এ ঘরটা কীসের ছিল? জিজ্ঞেস করলাম, একটি আধাভাঙা কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে। লায়লা ঝুঁকে দেখলো, সম্ভবত শস্যভান্ডার। দিলমুনের মানুষ খুব সুশৃঙ্খল ছিল। তারা রাজ্যের সম্পদ হিসাব করে রাখতো।

একটু থেমে বললো, আসলে জানো, প্রতিটি পাথরের একটা গল্প আছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, দাদা আমাকে এখানে নিয়ে আসতেন। বললেন লায়লা, এ মাটির নিচে তোমার পূর্বপুরুষরা ঘুমিয়ে আছে। বললাম, তুমি কি এখনো তাই মনে করো? লায়লা একটু হাসলো, আমি মনে করি, ইতিহাস কখনো মরে না। শুধু মাটির নিচে চলে যায়। কেউ খুঁজলে পাওয়া যায়। কথাটা মনে গেথে গেল।

বেলা ১২টার দিকে রোদ চড়া হয়ে উঠলো। লায়লা বললো, চলো, পেট না ভরলে ইতিহাস হজম হবে না। হাসতে হাসতে বললাম, দারুণ যুক্তি। কাছেই একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁ, আল-মাতাম। সাদা দেওয়াল, খেজুর কাঠের ছাদ, টেবিলে ঐতিহ্যবাহী নকশার কাপড়। লায়লা অর্ডার দিলো আমার হয়ে মাচবুস, বাহরাইনের জাতীয় খাবার। সুগন্ধি চালের সঙ্গে মাটন, জাফরান, গোলমরিচ ও শুকনো লেবু দিয়ে রান্না করা। ফাত্তুশ সালাদ- তাজা শসা, টমেটো, পুদিনা আর ক্রিস্পি পিটা রুটির টুকরো। খুবুজ- গরম গোলাকার আরবি রুটি।

প্রথম কামড়েই বললাম, এটা অসাধারণ! জাফরানের গন্ধটা একদম আলাদা। লায়লা খুশি হলো, মাচবুস রান্না করতে পারলে বাহরাইনে যেকোনো মায়ের কাছে বাহবা পাবে। তুমি রান্না করতে পারো? জিজ্ঞেস করলাম। একটু লজ্জা পেলো, পারি। তবে দাদির মতো না। দাদি বলতেন- রান্নায় শুধু মসলা না, ভালোবাসাও দিতে হয়। বললাম, তাহলে তোমার রান্না নিশ্চয়ই ভালো। লায়লা চোখ তুলে তাকালো, তারপর মুচকি হেসে বললো, তুমি কিন্তু বেশি বলছো। ফেরার পথে লায়লা বললো, একটু চা খাবে? এখানে একটা পুরোনো ক্যাফে আছে। কাহওয়া হাউস- ছোট্ট একটি আরবি ক্যাফে। দেওয়ালে পুরোনো বাহরাইনের ছবি, কাউন্টারে বড় একটি কফি পাত্র।

দুটো কাপে এল কাহওয়া- আরবি কফি। হালকা সোনালি রঙ, এলাচ আর জাফরানের সুগন্ধ। সঙ্গে তামর-নরম খেজুর। এটা কফি, না চা? জিজ্ঞেস করলাম। লায়লা হাসলো, আরবিতে কাহওয়া মানে কফি। কিন্তু এটা তোমার চেনা কফি না। এখানে রোস্ট কম, এলাচ বেশি। চুমুক দিলাম। সত্যিই অন্যরকম, তেতো না, কিন্তু মিষ্টিও না। একটা উষ্ণ, সুগন্ধি অনুভূতি।

আজকের দিনটার কথা অনেকদিন মনে থাকবে, বললাম। লায়লা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, বিকেলের আলোয় খেজুর গাছগুলো লম্বা ছায়া ফেলেছে। আমারও, বললো আস্তে।

সন্ধ্যার আগেই রওনা দিলাম। শেখ খলিফা হাইওয়ে ধরে ফিরছি মানামার দিকে। পশ্চিমে সূর্য নামছে উপসাগরের বুকে আকাশ লাল, কমলা, সোনালি। লায়লা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো, প্রতিদিন এ সূর্যাস্ত দেখি। কিন্তু একা দেখলে মনে হয় কিছু একটা নেই। বললাম, আজকে একা না। সে ফিরে তাকালো। চোখে হাসি। না, আজকে না।

মানামার আলো দূর থেকে ভেসে আসছে। পেছনে পড়ে রইল চার হাজার বছরের ইতিহাস আর একটি অসাধারণ দিনের স্মৃতি।

শেয়ার করুন