জেনরিউ-জি জেন মন্দিরের সামনে লেখক
টোকিওর পার্শ্ববর্তী শহর কিয়োটোর আরাশিয়ামার সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে এক অনন্য স্থাপত্য-টেনরিউ-জি জেন মন্দির। ইউনেসকো হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত এ মন্দিরটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি জাপানের জেন দর্শনের এক গভীর নিঃশ্বাস, যেখানে নীরবতা কথা বলে আর প্রকৃতি ধ্যানের ভাষা হয়ে ওঠে।
আমি সেদিন সকালে কিয়োটো স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে আরাশিয়ামার পথে রওনা দিলাম। জানালার বাইরে কাতসুরা নদীর জল চিকচিক করছিল। আমার পাশে বসে ছিল নিকিতা-আমার গাইড, আমার সহযাত্রী। সে বললো, আজ তুমি কিয়োটোর হৃদয় দেখতে চলেছো।
ট্রেন থেকে নেমে আমরা হাঁটছি টেনরিউ-জি জেন মন্দিরের দিকে। নিকিতা বলে, টেনর্রিউ-জি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৩৩৯ সালে, মুরোমাচি যুগে। শোগুন Ashikaga Takauji সম্রাট Emperor Go-Daigo-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এ মন্দির নির্মাণ করেন। এটি রিনজাই জেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান মন্দিরগুলোর একটি। দুর্ভাগ্যবশত, টেনর্রিউওজি বহুবার অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়েছে। তবুও প্রতিবারই এটি নতুন করে পুনর্নির্মিত হয়েছে, যেন ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো এক প্রতীক। আজকের স্থাপত্যের অনেকাংশই পরবর্তী পুনর্নির্মাণের ফল, কিন্তু তার আত্মা রয়ে গেছে সেই প্রাচীন যুগেই।
১৯৯৪ সালে এটি ‘Historic Monuments of Ancient Kyoto’ শিরোনামে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়, কিয়োটোর ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে। মন্দিরের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢ়ুকতেই একটা গাম্ভীর্য আমাদের ঘিরে ধরলো। নিকিতা বলে, ১৩৩৯ সালে নির্মিত এই মন্দিরের মূল আকর্ষণ হলো এর সিলিংয়ে আঁকা DbwiD-Ry বা মেঘের ড্রাগন। নিকিতা আমাকে হলের ছাদের দিকে তাকাতে বললো। দেখলাম, বিশাল বৃত্তাকার পটে আঁকা এক রুদ্ররূপী ড্রাগন। সে ফিসফিস করে বললো, জানো, একে বলা হয় সব দিক দেখা ড্রাগন। তুমি হলের যে প্রান্তেই যাও না কেন, মনে হবে ড্রাগনটি ঠিক তোমার চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে।
আমি কয়েক পা পিছিয়ে পরীক্ষা করলাম। সত্যিই! ড্রাগনের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যেন আমাকেই অনুসরণ করছে। নিকিতা একটু হেসে যোগ করলো-জেন দর্শনে ড্রাগন হলো সুরক্ষার প্রতীক। এ ড্রাগনটি কেবল মন্দিরের রক্ষক নয়, এটি মানুষের অন্তরের সত্যকেও পাহারা দেয়। ড্রাগনের সেই অপলক দৃষ্টি আর নিকিতার শান্ত উপস্থিতি মিলে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি হলো হলের ভেতর।
এরপর আমরা এলাম সোগেনচি পুকুরের ধারে। ৭০০ বছর আগের সেই বাগানটি এখনো অবিকল তেমনই আছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাথর আর জলের খেলা দেখতে দেখতে নিকিতা আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, নিকিতা, এ শান্ত বাগান আর ড্রাগনের রহস্য-সব মিলিয়ে যেন অন্য কোনো যুগে চলে এসেছি। নিকিতা সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, তুমি তো সব সময় ইতিহাস খুঁজো। কিন্তু জাপানিরা এ মুহূর্তের অনুভূতিকে খুব গুরুত্ব দেয়।
মন্দিরের উত্তর গেট দিয়ে যখন বের হচ্ছি, তখন সামনেই সুবিশাল সাগানো বাঁশবন (Bamboo Forest)। বাঁশগাছের ফাঁক দিয়ে আসা বিকালের রোদে নিকিতার মুখটা সোনার মতো জ্বলজ্বল করছিল। নিকিতা হাঁটতে হাঁটতে জাপানি ভাষায় একটা কবিতা আবৃত্তি করছিল। আমি ওর হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে বললাম, নিকিতা, টেনরিউ-জির এ ড্রাগন বা বাগান হয়তো চিরকাল থাকবে, কিন্তু তোমার মুখে এ কবিতা শোনার স্মৃতিটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় হেরিটেজ।
নিকিতা মুখ নামিয়ে মিষ্টি করে হাসলো।
কিয়োটোর টেনরিউ-জির সেই ড্রাগন আর শান্ত পুকুরকে পেছনে ফেলে আমরা যখন ফিলোসফার্স পাথ বা তেৎসুগাকু-নো-মিচিতে পৌঁছলাম, তখন বিকালের আলোটা আরো মায়াবী হয়ে উঠেছে। নিকিতা বললো, এটি কেবল একটি হাঁটার পথ নয়, এটি যেন নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার এক নির্জন আয়না। নিকিতা বলে, বিখ্যাত দার্শনিক নিশিনো কিতারো প্রতিদিন এ পথে হাঁটতেন আর জীবন নিয়ে ভাবতেন। হেইয়ান শ্রাইনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট খালের পাড়ঘেঁষে এ দুই কিলোমিটারের পথটি আজ আমাদের।
আমি তার কথার কোনো জবাব দিই না। নিকিতা আজ একটু চুপচাপ। ওর কিমোনোর আঁচলটা ঘাসের ওপর দিয়ে আলতো করে ঘষে চলেছে। খালের জলে দুয়েকটা ঝরাপাতা ভেসে যাচ্ছে। আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, নিকিতা, দার্শনিকরা এখানে হাঁটতেন পরম সত্যের খোঁজে। আমি তো এখানে শুধু তোমার হাঁটার ছন্দ দেখছি। নিকিতা থামলো। খালের ধারের একটা পাথুরে বেঞ্চে বসে ও জলের দিকে তাকিয়ে বললো, সত্যিই তো, তুমি কি জানো? জাপানিরা বিশ্বাস করে, প্রবহমান জল আমাদের শেখায় যে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এই যে আমরা হাঁটছি, এ মুহূর্তটাও একদিন স্মৃতি হয়ে ভেসে যাবে। সে কারণেই এ পথটা এতো সুন্দর।
আমি ওর পাশে বসলাম। চারপাশটা এতোই নিঃশব্দ যে বাতাসের ঝিরঝির শব্দও শোনা যাচ্ছে। নিকিতা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, নিশিনো কিতারো বলতেন, নিজেকে চেনার জন্য মাঝেমধ্যে হারিয়ে যেতে হয়। তুমি কি এই পথে আমার সঙ্গে হারিয়ে যেতে রাজি?
ওর চোখের কোণে এক চিমটি দুষ্টুমি আর এক আকাশ গভীরতা। আমি ওর হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললাম, এ পথে যদি হারাই, তবে সে হারিয়ে যাওয়াটাও হবে আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি।
নিকিতা মৃদু হাসলো। গিনকাকু-জি মন্দিরের কাছাকাছি যখন পৌঁছলাম, তখন আকাশের রঙ বদলে বেগুনি হয়ে গেছে। আমাদের ছায়া দুটো খালের জলে মিলেমিশে একাকার। মনে হলো, এ ফিলোসফার্স পাথ আমাদের কেবল গন্তব্যে পৌঁছে দেয়নি, আমাদের দুজনকে আরো একটু কাছে এনে দিয়েছে। গিনকাকু-জি বা সিলভার প্যাভিলিয়নের সে রুপালি বালুর বাগান যখন বিকালের শেষ আলোটুকু শুষে নিলো চারপাশটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। পর্যটকদের ভিড় কমে এসেছে, পাহাড়ি ঢাল থেকে নেমে আসা শীতল হাওয়া নিকিতার কিমোনোর হাতা উড়িয়ে দিচ্ছে বারবার।
আমরা দুজনে মন্দিরের বিখ্যাত চন্দ্র দর্শন মঞ্চের (Moon Viewing Platform) কাছে এসে দাঁড়ালাম। নিচে সাদা বালুর নিখুঁত কারুকাজ, যা চাঁদের আলো প্রতিফলিত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। নিকিতা আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আমার দিকে ফিরলো। ওর চোখের মণি দুটো এ মায়াবী আলোয় ঠিক যেন দুটি কালো হীরে।
নিকিতা বলে, জানো, এ মন্দিরটার নাম সিলভার প্যাভিলিয়ন হলেও এখানে কোথাও রুপো নেই। এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর অসম্পূর্ণতায়। জাপানিরা একে বলে Wabi-sabi, যা কিছু পুরোনো, যা কিছু অসম্পূর্ণ, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরম যত্ন। আমার কাছেও অসম্পূর্ণতাই বেশি সুন্দর, নিকিতা। যেমন এ বিকালটা যদি কোনোদিন শেষ না হতো, তবে হয়তো এর পূর্ণতার কদর থাকতো না। কিন্তু তুমি পাশে আছো বলেই এ শূন্যতায় ভরা বাগানটাও আমার কাছে কানায় কানায় পূর্ণ মনে হচ্ছে।
নিকিতা একটু কাছে সরে এলো। ওর শরীর থেকে চেরি ব্লসম আর চন্দনের খুব হালকা একটা সুবাস আসছে। ও নিচু স্বরে বললো, সবাই কিয়োটোতে আসে ছবি তুলতে, কিন্তু তুমি এসেছো, মুহূর্তগুলো ছুঁতে। এই যে আমরা আজ সারাটা দিন হাঁটলাম, টেনরিউ-জি থেকে ফিলোসফার্স পাথ হয়ে এখানে, তোমার কি একবারও মনে হয়নি যে, আমরা আসলে কোনো একটা গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছি?
আমি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকি। কিন্তু কোনো জবাব দিই না। গিনকাকু-জির সেই রুপালি মায়া কাটিয়ে আমরা যখন কিয়োটোর গলিঘুঁজিতে ঢুকলাম, তখন চারপাশটা সেজেছে লাল লণ্ঠনের মায়াবী আলোয়। সরু গলি, দুপাশে কাঠের পুরোনো বাড়ি আর মাঝে মাঝে সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ। নিকিতা আমাকে নিয়ে এলো পাড়ার এক লুকানো ইজাকায়াতে (জাপানিজ পানশালা)। দরজায় নীল রঙের পর্দা (Noren) ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে এলো গ্রিল করা ইয়াকিতোরি (Yakitori) আর সয়া সসের মন মাতানো সুবাস। ভেতরের পরিবেশটা বেশ উষ্ণ। কাঠের কাউন্টার, দেওয়ালজুড়ে জাপানি ক্যালিগ্রাফি আর পেছনের শেলফে সাজানো মাটির সব পাত্র। আমরা কোণার একটা টেবিলে বসলাম। নিকিতা বলে-জানো, ইজাকায়া মানে শুধু খাওয়া নয়, এটা হলো মনের আগল খুলে দেওয়ার জায়গা। এখানে মানুষ আসে দিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে। তুমি কি আজ ক্লান্ত?
তোমার সঙ্গে হাঁটলে কি আর ক্লান্তি থাকে? আমি বললাম।
খানিকবাদেই আমাদের সামনে এলো ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ সাকে (Atsukan)। ছোট ছোট মাটির কাপে (Choko) সাকে ঢালতে ঢালতে নিকিতা এক অদ্ভুত নিয়ম শেখালো। বললো, জাপানে নিজের কাপ নিজে পূর্ণ করতে নেই। এটা হলো সম্মানের আর ভালোবাসার চিহ্ন। আমি তোমার কাপ ভরে দিচ্ছি, আর তুমি আমারটা।
কাপ দুটো আলতো করে ছোঁয়াতেই একটা টুং করে শব্দ হলো। নিকিতা চোখের ইশারায় বললো, কানপাই! (চিয়ার্স)। সাকের প্রথম চুমুকটা গলার ভেতর দিয়ে নামতেই এক অদ্ভুত উষ্ণতা শরীর ছাপিয়ে মনে গিয়ে লাগলো। আমি বললাম, নিকিতা, এই যে চেরি ব্লসমের মতো তোমার হাসি আর এ সাকের ওম-সবটা যেন একটা স্বপ্নের মতো।
নিকিতা এবার একটু ঝুঁকে এলো আমার দিকে। লাল লণ্ঠনের আলো ওর মুখে পড়ে এক মায়াবী ছায়া তৈরি করেছে। ও নিচু স্বরে বললো, সাকুয়া (Sakuya) বলে একটা শব্দ আছে আমাদের এখানে। যার মানে হলো কাল রাতের ফোটা ফুল। কিন্তু আমি চাই আমাদের এ মুহূর্তটা যেন ঝরে না যায়। আমি ওর হাতটা টেবিলের ওপর নিজের হাতের ওপর টেনে নিলাম। সাকের নেশার চেয়েও ওর চোখের নেশা তখন অনেক বেশি গাঢ়। নিকিতা ওর কাপটা তুলে ধরে বললো, আজ রাতটা শেষ হওয়ার আগে একটা প্রতিজ্ঞা করো। কিয়োটোর এ অলিগলি আর আমার এ হাসি কখনো ভুলে যাবে না তো?
বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ইজাকায়ার কাচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো জমছে, আর ভেতরে আমরা দুজন-সাকের উষ্ণতায় আর হৃদয়ের নিবিড়তায় একে অন্যের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছি।