টেক্সাসের ফ্রিসকো সিটিতে মেয়র নির্বাচনে বিজয়ী মার্ক হিল
টেক্সাসের দ্রুত বর্ধনশীল শহর ফ্রিসকোতে অনুষ্ঠিত মেয়র পদে রানঅফ নির্বাচন শুধু স্থানীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের ভোট ছিল না; এটি শহরের বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ গণরায়ে পরিণত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা গত ১৪ জুন বিভাজনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা দেওয়া প্রার্থী মার্ক হিলকে নতুন মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা যায়, রক্ষণশীল আইনজীবী ও সাবেক স্কুল বোর্ড সদস্য মার্ক হিল প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী রড ভিলহাওয়ার পান প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ভিলহাওয়ার ফ্রিসকোর ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, শরিয়াভিত্তিক জীবনধারা অনুসরণকারী মুসলমানদের তিনি স্বাগত জানাবেন না এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। এর আগে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামকে ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তার এসব বক্তব্য স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। নাগরিক অধিকার সংগঠন, মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা এবং অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এসব মন্তব্যকে বিদ্বেষমূলক ও বিভাজন সৃষ্টিকারী বলে অ্যাখ্যা দেন।
অন্যদিকে মার্ক হিল নিজেকে একজন রক্ষণশীল রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দিলেও নির্বাচনী প্রচারণায় ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি শহরের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একত্রিত করার, রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর এবং ফ্রিসকোর ইতিবাচক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন। তার বক্তব্য ছিল, ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্তির রাজনীতি শহরের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। নির্বাচনী প্রচারণার এক পর্যায়ে হিল বলেন, যদি কোনো পরিবার নিউ জার্সি, বোস্টন, সান ফ্রান্সিসকো বা বিশ্বের অন্য কোনো স্থান থেকে এখানে আসার কথা ভাবেন এবং তারা বর্তমানের এই ধরনের বক্তব্য শুনেন, তাহলে তারা ফ্রিসকোতে আসতে চাইবেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনটি ছিল চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কতটা কার্যকর হতে পারে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রিপাবলিকান রাজনীতিক ও প্রার্থীর বক্তব্যে ইসলামবিরোধী অবস্থান বেশি দেখা গেলেও ফ্রিসকোর ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সাধারণ নির্বাচনে এ ধরনের প্রচারণা সবসময় সফল নাও হতে পারে।
ডালাস শহর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত ফ্রিসকো গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। একসময়ের ছোট শহরটি এখন প্রায় আড়াই লাখ মানুষের আবাসস্থল। জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এশীয় বংশোদ্ভূত, যার মধ্যে ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, শহরের শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যার হার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একটি নতুন মসজিদ, জৈন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় এবং হিন্দু মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্কের কারণে ফ্রিসকো জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সিটি কাউন্সিলের বৈঠকগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জনমত গ্রহণের সময় অনেকেই এসব প্রকল্পের বিরোধিতা করেন। পরে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় কাউন্সিল কিছু বৈঠকে সাধারণ নাগরিকদের উন্মুক্ত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও সীমিত করে।
বিদায়ী মেয়র জেফ চেনি জানান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বড় অংশই ফ্রিসকোর বাসিন্দা ছিলেন না। তার ভাষায়, অনেকেই অন্য শহর বা অন্য রাজ্য থেকে এসে স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ফ্রিসকোর নির্বাচন শুধু একটি শহরের মেয়র নির্বাচন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত জনসংখ্যাগত বাস্তবতার প্রতিফলন। দক্ষিণ এশীয়, মুসলিম এবং অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের দ্রুত বৃদ্ধি অনেক এলাকায় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। সেই বাস্তবতায় বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা হবে নাকি ভয়ের রাজনীতি প্রাধান্য পাবে এ বিষয়ে ফ্রিসকোর ভোটাররা তার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।ফলাফল প্রকাশের পর স্থানীয় মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের অনেক নেতা এটিকে সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে মার্ক হিল প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের বিতর্কে না গিয়ে অবকাঠামো, জননিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনার মতো স্থানীয় বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন।
ফ্রিসকোর এই নির্বাচন এখন জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ফলাফলটি দেখিয়েছে যে, বৈচিত্র্যময় আমেরিকান শহরগুলোতে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী প্রচারণা সব সময় ভোটারদের সমর্থন পায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা ঐক্য, অন্তর্ভুক্তি এবং সহাবস্থানের বার্তাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।