০১ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৮:৪৯:০৩ অপরাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-১৭
আল আইনের ছায়ায়
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-০৭-২০২৬
আল আইনের ছায়ায় আল আইন ওয়েসিস


ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। দুবাইয়ের ইউনিয়ন মেট্রো স্টেশন (Union Metro Station) থেকে সকাল ৭টায় বের হলাম। গন্তব্য আমিরাতের প্রাচীন শহর-আল আইন। দুবাই থেকে দূরত্ব মাত্র ১৫০ কিলোমিটার, শেখ জায়েদ রোড ধরে (Sheikh Zayed Road) ই-৬৬ (E66) হাইওয়েতে উঠলে গাড়িতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।

আগের দিনই ওমান বাস (Oman Bus) বা দুবাই আরটিএ বাস (Dubai RTA Bus) সার্ভিসে টিকেট কেটে রেখেছিলাম। Gold Souk Bus Terminal থেকে এ বাস সরাসরি যাবে আল আইন বাস স্টেশনে (Al Ain Bus Station)। ভাড়া মাত্র ২৫ দিরহাম। 

কাটায় কাটায় সকাল ৭টায় বাস ছাড়লো। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি মরুভূমি ছুটে যাচ্ছে। বালির সোনালি ঢেউ, মাঝে মাঝে খেজুরগাছের সারি। দুবাইয়ের কাচের দালান পেছনে ফেলে এ পথ যেন সময়ের উলটো দিকে যাত্রা। সকাল নটার দিকে বাস এসে থামল আল আইন সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে। আগে থেকেই ট্যুর বুক করে নিয়েছিলাম। বাস থেকে নামতেই চোখে পড়লো সাদা-নীল হিজাব পরা একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটি ছোট্ট সাইনবোর্ড- Al Ain Oasis Tour। চোখ দুটো কাজলকালো, ঠোঁটের কোণে এক ধরনের শান্ত আভিজাত্য। কাছে যেতেই সে মৃদু হেসে বললো-আহলান ওয়া সাহলান! Welcome to the oldest living oasis in the Emirates… তার কণ্ঠে ছিল ইতিহাসের সুর।

আমি লায়লা আল মাজরুঈ। আজকের দিনে এ ওয়েসিস ট্যুরে আমি তোমার গাইড। তার ইংরেজিতে একটা আরবি সুর ছিল-নরম এবং গভীর। লায়লা মানে তো রাত-আমি বললাম। সে একটু অবাক হয়ে বলে-তুমি আরবি জানো?

-না, শুধু লায়লা-মজনুর গল্প পড়েছি।

লায়লা হেসে বললো-সেই লায়লা কিন্তু বাস্তবেও ছিলেন আর তিনি ছিলেন এ মরুভূমির মেয়ে। একটা ট‍্যাক্সি নিয়ে আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছলাম আল আইন ওয়েসিসের (Al Ain Oasis)-এর প্রধান ফটকে। সাইনবোর্ডে লেখা: UNESCO World Heritage Site- 2011.

লায়লা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বললো-বাইরে তাপমাত্রা কিন্তু ৩৮ ডিগ্রি, ভেতরে প্রায় ৮-১০ ডিগ্রি কম। সত্যিই। গেট পেরোতেই যেন একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস মুখে এসে লাগল। হাজার হাজার খেজুর গাছ মাথার উপরে ছাদ তৈরি করেছে। সরু মাটির পথ, দুপাশে সবুজ। শহরের কোলাহল মুহূর্তে হারিয়ে গেল। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে ঢুকছিলাম। লায়লা ওয়েসিসের ইতিহাস শোনাচ্ছিল। এ ওয়েসিসের বয়স কমপক্ষে চার হাজার বছর। এখানে মানুষ বসতি গেড়েছে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে। কল্পনা করো, যখন ইউরোপ মানুষ বনে জঙ্গলে ঘুরছে, তখন এ মরুভূমিতে সভ্য মানুষ সেচ ব্যবস্থা তৈরি করে খেজুর চাষ করছে।

এ পানি কোথা থেকে আসে?-আমি জিজ্ঞেস করলাম। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।-এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। আল হাজার পর্বতমালা থেকে ভূগর্ভস্থ পানি টেনে আনা হয় ফালাজ পদ্ধতিতে-এটি একটি প্রাচীন ভূগর্ভস্থ সেচ নালা। পারস্য থেকে আসা এ প্রযুক্তি দুই হাজার বছরেরও পুরোনো এবং আজও ২০২৬ সালেও এ নালা দিয়ে পানি বইছে।

আমি একটু মজা করে বললাম, -তোমার মতো সুন্দর কাউকে গাইড হিসেবে পেলে ইতিহাসও আরো সুন্দর লাগে। সে হালকা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বললো,-‘History becomes beautiful when someone listens with heart…’

আমরা একটু এগিয়ে একটি খোলা ফালাজের পাশে দাঁড়ালাম। ছোট্ট স্বচ্ছ নালায় পানি বইছে-শান্ত, সাবলীল। -এ পানির গান কি শুনতে পাচ্ছো? লায়লা কৌতুক করে বললো। তোমার কণ্ঠস্বর শুনলে এ নালার গান আর কানে পৌঁছায় না, আমি জবাব দিলাম। লায়লা আমার দিকে চোখ তুলে চাইলো। তারপর খুব শান্তভাবে বললো-তুমি কি সব সময় এভাবেই কথা বলো? আমি বললাম-সব সময় না। তবে যখন বিশেষ বিশেষ মানুষের সংস্পর্শে আসি তখন। আমার কথা শুনে লায়লা উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। ওয়েসিসের ভেতরে আছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার খেজুর গাছ-একশোর বেশি প্রজাতির। লায়লা একটি গাছের কাছে থামলো।

-এ গাছটির বয়স আমার দাদার বয়সের চেয়েও বেশি। আমাদের পরিবারের একটি ছোট্ট অংশ এ ওয়েসিসে আছে। আমার দাদি বলতেন, খেজুর গাছ হলো মরুভূমির মা। মাথা সূর্যে, পা পানিতে, পিঠে বোঝা-তবুও ফল দেয়। আপনার মতো?-আমি বললাম। লায়লা একটু ভুরু কুঁচকে তাকালো। তারপর বললো-হয়তো। তবে আমি এখনো ফল দেওয়া শুরু করিনি।

লায়লা দ্রুত হাঁটা শুরু করলো সামনে। তার কান দুটো লাল হয়েছিল, আমি দেখলাম। ওয়েসিসের মাঝামাঝি আছে একটি ছোট্ট ভিজিটর সেন্টার ও হেরিটেজ মিউজিয়াম (Visitor Center I Heritage Museum)। এখানে ফালাজ সেচ পদ্ধতির মডেল, পুরোনো কৃষি যন্ত্রপাতি আর আল আইনের হাজার বছরের মানচিত্র সংরক্ষিত রয়েছে।

লায়লা একটি পুরোনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বললো-এটি ১৯৬০ সালের ছবি। তেল আবিষ্কারের আগে। দেখো, তখনো এ ওয়েসিস ছিল। তখন এ শহরের মানুষের পুরো জীবননির্ভর করতো এ বাগানের উপর।-এখন? এখন আমরা স্কাইস্ক্র্যাপার বানাই। কিন্তু আমাদের দাদিরা এখানে আসেন। মাটি ছোঁন। বলেন-এটাই আসল ঘর। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ লায়লা বললো-আমি তোমাকে এখন এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাব যেখানে ট্যুরিস্টরা সচরাচর যায় না।

আল আইন ওয়েসিসের কাছেই, Al Jimi এলাকায়, একটি ছোট্ট ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ- Al Diwan Restaurant। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে মনে হয় পুরোনো আরবি বৈঠকখানায় ঢুকে পড়েছি। মেঝেতে কার্পেট, দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফি, বাতাসে উদ ও গোলাপজলের গন্ধ।

লায়লা অর্ডার করলো- Harees-গম ও মাংস একসঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্না করা আমিরাতি ঐতিহ্যবাহী পদ। Machboos Laham-মসলা ও কেশর দিয়ে রান্না করা মাংসের বিরিয়ানি। Fattoush Salad-তাজা সবজি ও ক্রিসপি রুটির সালাদ। Khameer Bread-খেজুর ও এলাচ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী রুটি। Karak Chai- এলাচ, আদা ও গুঁড়োদুধে তৈরি গাঢ় চা। লায়লা হাতে কামের রুটি ভেঙে বললো- Harees খেতে হবে দুই হাতে ধরে। এটি শেয়ার করার খাবার। তোমার সঙ্গে ভাগ করে খেলে যেকোনো খাবারই ভালো লাগবে-আমি বললাম। সে কোনো জবাব নাদিয়ে কথা ঘুরিয়ে বললো- Machboos খাও। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে যে হাসিটুকু লুকিয়ে ছিল-তা আমার চোখ এড়ায়নি।

লায়লা বললো, এ খাবারগুলো আমাদের সংস্কৃতির অংশ- simple but full of soul. আমি বললাম, আজকের দিনটা সত্যিই মনে রাখার মতো হয়ে গেল... আপনার জন্য। সে মৃদু হাসলো।

দুপুরের পর আরো একবার ওয়েসিসে ঢুকলাম। বিকালের হলুদ আলোয় খেজুর গাছগুলো অন্যরকম দেখাচ্ছিল। লায়লা বললো, সূর্য ঢলে পড়লে আলো এসে পড়ে তির্যকভাবে, প্রতিটি পাতা তখন সোনার মতো জ্বলে আমরা একটি বেঞ্চে বসলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তুমি কি এ শহরটাকে ভালোবাসো, আমি জিজ্ঞেস করলাম। আল আইন? লায়লা একটু চুপ থেকে বললো-দুবাই যদি হয় আমাদের ভবিষ্যৎ, তাহলে আল আইন হলো আমাদের আত্মা। এ মাটি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমরা কে ছিলাম।

আর এখন কে? লায়লা আমার দিকে তাকালো। মৃদু স্বরে বললো-সেটা আমি এখনো খুঁজছি। বিকাল চারটায় ওয়েসিস থেকে বের হয়ে আমরা গেলাম Café Arabia-তে-Al Ain Mall-এর কাছে, Khalifa Street-এ।

অর্ডার করলাম: Qahwa-ঐতিহ্যবাহী আরবি কফি, হালকা সোনালি রঙের, এলাচ ও জাফরান দিয়ে তৈরি। Luqaimat-মধু ও তিল ছড়ানো ছোট্ট মিষ্টি ডোনাট। লায়লা ছোট্ট ফিঞ্জান কাপে কফি ঢেলে দিলো। Qahwa পান করার নিয়ম আছে। কাপ খালি করলে আর দেবে। না চাইলে এভাবে নাড়াতে হয়।-সে কাপটি হাতে ধরে একটু কাত করে দেখালো। আর যদি আরো বেশি চাই? তাহলে চুপ করে বসে থাকুন। তোমার মতো? লায়লা হাসলো। তারপর বললো তুমি কবে নিউইয়র্ক ফিরছো?

কেন? মিস করবে? লায়লা কোনো জবাব না দিয়ে হাসলো। বাইরে বিকেলের আলো তখন পাকা খেজুরের রঙ নিয়েছে। বললাম-ধন্যবাদ। আজকের দিনটা মনে থাকবে। লায়লা মৃদু স্বরে বললো-আমারও। লায়লার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললাম/ইউনেস্কো হেরিটেজ দেখতে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি একজন অসাধারণ নারীর বন্ধুত্বের স্মৃতি। আল আইনের সৌন্দর্য তো আসলে তোমার চোখের আয়নাতেই প্রতিফলিত হচ্ছিল। লায়লা মৃদু হাসল, সে হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় Al Ain Bus Station থেকে দুবাইয়ের বাস ধরলাম। লায়লা গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলো।

যখন গাড়িতে উঠলাম, আয়নায় দেখলাম গোধূলির আলোয় সে আরবীয় সুন্দরীর আবছা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। আল আইন ওয়েসিসের ইতিহাস আর লায়লার লাবণ্য-দুই মিলিয়ে সফরটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা অধ্যায় হয়ে রইলো।

বাস ছাড়লো। জানালা দিয়ে তাকালাম, লায়লা দাঁড়িয়ে আছে। সাদা-নীল হিজাব, পেছনে আল আইনের আকাশ রঙিন হয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন