২১ এপ্রিল ২০১২, রবিবার, ০২:৫২:১২ অপরাহ্ন


রোহিঙ্গা শিশুরা এখন ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারছে
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৪-১২-২০২২
রোহিঙ্গা শিশুরা এখন ইংরেজি   বলতে ও লিখতে পারছে


৬-১৪ বছর বয়সী রোহিঙ্গা এবং এর পাশাপাশি হোস্ট কমিউনিটি শিশুদের মধ্যে ইংরেজি বলতে, পড়তে ও লিখতে পারার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ১১ শতাংশ থেকে ৩৫.৫১ শতাংশে। অন্যদিকে ৯৯.২৭ শতাংশ শিশুর অভিভাবক তাদের সন্তানকে বাসায় পড়তে সহযোগিতা করে এবং উৎসাহ দেয়। রোহিঙ্গা ও হোস্ট কমিউনিটি মিলিয়ে সাক্ষর দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রমের মধ্য এটা সম্ভব হয়েছে। 

রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে লার্নিং শেয়ারিং ওয়ার্কশপে এসব তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মত রোহিঙ্গা এবং হোস্ট কমিউনিটিতে সমন্বিত শিশু বিকাশ কেন্দ্র নিয়ে কাজ করছে ইউনিসেফ “প্রোভাইডিং আর্লি চাইল্ডহুড এন্ড বেসিক এডুকেশন ফর রোহিঙ্গা এন্ড হোস্ট কমিউনিটি চিল্ড্রেন” প্রকল্পের মাধ্যমে, যা বাস্তবায়ন করছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

ইউনিসেফ এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ শিশুর সামগ্রিক উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর তাই শিশুদের আনন্দদায়ক পরিবেশের মধ্য দিয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্কুলের জন্য প্রস্তুত করতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং হোস্ট কমিউনিটিতে মোট ৬০টি সমন্বিত শিশু বিকাশ কেন্দ্র পরিচালনা করছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। এটি বাংলাদেশের প্রথম মডেল যা শিশুর সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা, ওয়াশ সেক্টরকে সম্পৃক্ত করেছে। 

৫টি ক্যাম্পে এবং হোস্ট কমিউনিটির মধ্যে রাজাপালং ইউনিয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ১৪৪০ জন ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সুন্দর বিকাশ নিশ্চিতে কাজ করছে এই কেন্দ্রগুলি। ৬০ জন ফ্যাসিলিটেটরের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলি পরিচালিত হয়। 

এই কেন্দ্রগুলি শিশুদের শুধু যে নিরাপদ পরিবেশে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে তা নয়, বরং তাদের পুষ্টি ও সাস্থ্য নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করা তত্ত্ব থেকে জানা যায়, এই শিশু বিকাশ কেন্দ্রের ফলে শিশুদের পুষ্টি স্বাস্থ্য তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে, স্ক্রিনিং এর দেখা যায়, ১৪৪০ জন এর মধ্যে ১৪২৭ জন শিশুর পুষ্টি অবস্থা সন্তোষজনক এবং কোন শিশুর মাঝেই পুষ্টিহীনতার লক্ষণ দেখা যায় নি। ১৩ জন এর মধ্যে সামান্য পুষ্টি ঘাটতি দেখা যায়। 

আলোচনায় উঠে আসে- শিশুদের বিকাশ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় টুল প্রস্তুতের বিষয়টি। যাতে করে শিশুদের প্রয়োজন চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের বিকাশ নির্ধারণ করা সহজ হয়। 

প্রকল্পের কার্যক্রম এর সফলতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করতে ২০২২ সালের শুরুতে এবং শেষে দুইটি মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয়। সেখানে উঠে এসেছে, প্রকল্পের সমন্বিত শিশু বিকাশ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশুই এখন স্কুলে যেতে আগ্রহী। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে ৩-৫ বছর বয়সী শিশুদের অভিভাবকদের প্রায় ৮৩ শতাংশের মধ্যে শিশুদের উন্নয়ন সংক্রান্ত সচেতনতা তৈরি হয়েছে। যা কার্যক্রমের শুরুতে ছিলো মাত্র ১৭ শতাংশ। হোস্ট কমিউনিটি ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ শতাংশ থেকে উন্নীত হয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশে। 


এছাড়াও এই মূল্যায়নে ক্যাম্প এবং হোস্ট কমিউনিটিতে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ উঠে আসে। এই মূল্যায়নে দেখা গেছে, মাত্র ৭.৫ শতাংশ বাবা-মা মনে করেন মেয়েরা কমিউনিটিতে অবদান রাখতে সক্ষম, ২২.৬৪ শতাংশ বাবা-মা মনে করেন লেখাপড়ার মধ্য দিয়ে তাদের মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।

পাশাপাশি মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম পাইলটিং এর মধ্য দিয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় মেয়েদের অন্তর্ভুক্ত করা। ২০২২ সালে ৫০০ জন মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাইলট উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মায়ানমার কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষক হয়ে উঠতে সহায়তা করছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে ৯৭ জন প্রশিক্ষিত নারী শিক্ষকের পুল তৈরি করা হয়েছে। যেন যারা পরবর্তীতে শিখন বিষয়ক চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে পারেন। 

২০২৪ এর মধ্যে আরও ১০০ জন নারী শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করা হবে বলে জানান, ইসরাত জাহান সুমি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট। 

রোহিঙ্গা ক্যাম্প-এ মেয়েদের শিক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নারী শিক্ষকের সংকট তার অন্যতম কারণ। আর তাই নারী শিক্ষক বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।  


কর্মশালা আলোচনা উঠে আসে রোহিঙ্গা এবং হোস্ট কমিউনিটি’র শিশুদের বিকাশ ও শিক্ষা নানারকম চ্যালেঞ্জ-এ জর্জরিত। তাদের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিতে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ। যেন তারা বেড়ে উঠতে পারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে। প্রশিক্ষিত রোহিঙ্গা নারী শিক্ষক এই সংকট মোকাবেলায় হতে পারে শক্তিশালী হাতিয়ার। 


প্রকল্পের অভিজ্ঞতা শেয়ারিং লক্ষ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মামুনুল আলম বলেন, রোহিংগাদের মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাষাগত ও যোগাযোগ দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম।   বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা খাতে উদ্যোগ গ্রহণ ও বিনিয়োগ করছে। সরকারি এবং বেসরকারি সকল সংস্থার মধ্যকার যে যৌথ উদ্যোগ তা আরো শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি। 

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার- কক্সবাজার  এর মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নানা বিধ চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার এক্ষেত্রে গুাংত্বসহকারে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। 

রোহিঙ্গা নারীদের শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগটিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (উপসচিব), বলেন মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা, রোহিঙ্গা সংকটের শুাংতে আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিলো তাদের জীবন রক্ষা করা। এখন আমরা তাদের শিক্ষার দিকে জোর দিচ্ছি, সেক্ষেত্রে মায়ানমার কারিকুলামের প্রতি আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।  পড়ালেখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কক্স বাজার শহরেও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

আশীষ কুমার বক্সী, হেড অব কক্স বাজার এন্ড সিএইচটি প্রোগ্রাম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ স্বাগত বক্তব্য রাখেন। 

শিশুদের সুরক্ষা, পুষ্টি, স্যানিটেশন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিতে, বিশেষ করে কিশোরীদের জন্য, সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহবান জানান কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাসিম আহমেদ।

ইউনিসেফ-এর এডুকেশন স্পেশালিস্ট ফ্রেডরিক লিংকনেক্ত বলেন, সমন্বিত শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো শিশুদের জন্য একটি ওয়ান স্টপ সল্যুশন মেকানিজম হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হবে। তারা এখানে শুধু শিখবেই না, বরং বিকশিত হবে, প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক স্কুলের জন্য তৈরি হবে। তাদের শিক্ষার পথ সুগম হবে। 

এডুকেশন সাপোর্ট সেক্টরের সহায়তায় দক্ষ শিক্ষক, বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী শিক্ষক গড়ে তোলার কাজ করে চলেছে ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালকে সাথে নিয়ে। 

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের গড়ে তোলে যেন তারা রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখে। 

শিক্ষার পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমে রোহিঙ্গা এবং হোস্ট কমিউনিটির নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান তিনি।  




শেয়ার করুন