০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বুধবার, ০৪:২৯:৫৩ অপরাহ্ন


নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলেই মহাবিপর্যয়
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০২-২০২৬
নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলেই মহাবিপর্যয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। শিডিউল অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সংসদ পাবে দেশ। তবে বহুল প্রতীক্ষিত এ-ই নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীর পাশপাশি সারা বিশ্ব তাকিয়ে আছে। 

যেসব চ্যালেঞ্জ সামনে

বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। ইতোমধ্যে যেসব খবর বেরুচ্ছে তাকে নানান উদ্বেগ উৎকন্ঠাকে কেউ অবহেলায় নিচ্ছেন না। কেননা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আট দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৫৩ জন। ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ৬৫টি। এতে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন। এদিকে গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে এরই মধ্যে নির্বাচনি মাঠে দায়িত্ব পালনে প্রশিক্ষণসহ পুলিশের দাপ্তরিক সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। তবে পুলিশের প্রস্তুতির বিষয়টি যেমন বেশ বড়ো করে দেখানো হচ্ছে তেমনি নতুন করে কিছু বিষয় সামনে চলে আসছে। তা হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের ভেঙে যাওয়া মনোবলের বিষয়টি। কেননা পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানেই দেওয়া হচ্ছে ভয়ঙ্কর তথ্য। তাতে বলা হচ্ছে গত বছর পুলিশের ওপর ৬০১টি হামলায় মামলা হয়েছে। এছাড়া গত বছর জানুয়ারিতে পুলিশের ওপর ৩৮টি হামলা হয়েছে, মে ও জুনে হয়েছে ১০৬টি। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মাস ডিসেম্বরেও পুলিশের ওপর ২৯টি হামলার মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন এমন অবস্থা বা খবর নির্বাচনী মাঠের জন্য সুখবর না, বরং অপরাধীরা বেপারোয়া হয়ে উঠতে পারে। কেননা পুলিশের মনোবল দুর্বল হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। পুলিশ যদি টহল বা তল্লাশি চালাতে অনিচ্ছুক হয় সেক্ষেত্রে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। 

প্রধান উপদেষ্টার সর্তক দৃষ্টি

আর এককারণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা সরকারের মূল দায়িত্ব। এটি জাতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে নির্বাচনকে একটি ঐতিহাসিক অর্জনে রূপ দিতে হবে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত গণভোট সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের দিন যেন কোথাও কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ২০২৬ সালের নির্বাচন এমন হতে হবে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। এদিকে ধারণা করা হচ্ছে পুলিশের মনোবল পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ্য রেখেই সম্ভবত ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলে ফেলেছেন অকপটে। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে প্রয়োজন হলে তারা ভোটকেন্দ্রে আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবে। 

শেষ কথা 

নিবন্ধিত ৫৯ রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ সদস্যের পর্যবেক্ষক দল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ জন ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের দুজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র-সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন এবারের নির্বাচন আসলেই দেশে বিদেশে সবাইকে আগ্রহী করে তুলেছে। ঢাকায় দফায় দফার কূটনৈতিক সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈঠক হচ্ছে। একিইভাবে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও বৈঠক করে যাচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে। বাংলাদেশে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে আসন্ন নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৩৩০ জন, যা ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ওই নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এর আগে ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৮ জন, ১১তম জাতীয় নির্বাচনে ১২৫ জন এবং ১০ম নির্বাচনে মাত্র চারজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন। অন্যদিকে ওআইসি’র দুই সদস্যের পর্যবেক্ষক দলটির নেতৃত্ব দেবেন সংস্থাটির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ইউনিটের প্রধান শাকির মাহমুদ বান্দার। এছাড়া এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল) থেকে ২৮ জন, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে ২৫ জন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে সাতজন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) থেকে একজন পর্যবেক্ষক আসবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যতের অবস্থানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণূ। অন্যদিকে আমেরিকাসহ পশ্চিমারাও অধীর অপেক্ষায় বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নির্বাচনের আয়োজনকে পর্যবেক্ষণে। কারো কারো মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়লে বাংলাদেশের জন্য অনেক বড়ো ধরনের বিপত্তি ডেকে আনতে পারে। পাল্টে যেতে পারে পুরো ভূ-রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ, যা রুখে দিখে পাল্টা কোনো পদক্ষেপে জনজীবন পড়তে পারে মহাবিপর্যয়ে মুখে।

শেয়ার করুন