বিজেপির উল্লাস
‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’ এটি মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচিত স্লোগান। সাধারণত নির্বাচনের সময় ভোটারদের উদ্দেশে বলা হয়। এর অর্থ, কারও সঙ্গে কোনো তর্ক বা উচ্চবাচ্য না করে, শান্তভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তৃণমূলের ‘জোড়াফুল’ বা ‘ঘাসফুল’ প্রতীকে ভোট দিন। কিন্তু মমতার ঘাসফুল এবার আর ফোটেনি। সেখানে ফুটেছে পদ্ম। নরেন্দ্র মোদীর ভাষায় বললে ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্মফুল ফুটেছে।’ এটাই বাস্তব, যে পশ্চিমবঙ্গে জয়জয়কার এবার বিজেপির। জয়টা একটু আধটু নয়, এক কথায় বিশাল জয়। ফলাফলে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফল প্রকাশ করে। এর মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। এছাড়া কংগ্রেস ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি ২টি করে এবং সিপিআই(এম) ও অল ইন্ডিয়া সেক্যুলার ফ্রন্ট ১টি করে আসন পেয়েছে।
এ নির্বাচনে বিজেপি ভোট পেয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তৃণমূল পেয়েছে ৪০ দশমিক ৮০ শতাংশ। ভারতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানিয়েছে। এই ফলাফলে আগের নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির আসন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা রাজ্যে দলটির সংগঠন ও প্রচারণার প্রভাবকে সামনে এনেছে। এ বিজয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এটিকে বিজেপির ‘ঐতিহাসিক’ সাফল্য বলে আখ্যা দেন। এখন প্রশ্ন বিজেপির এ জয়ে বাংলাদেশের সম্পর্কে কী কোনো প্রভাব পড়বে?
বিশ্লেষকরা বলছেন পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফল বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে:-
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন
পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে বিজেপি জয় হওয়ায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে, এমন আলোচনা বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বিজেপির “অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন” নীতি আবার সক্রিয় হয় সে ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি’র) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সংসদে আগেই আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে শরণার্থীদের ঢল নামানো হতে পারে, মুসলিমদের বের করে দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হবে না, এর কোনো গ্যারান্টি নেই।
কূটনৈতিক উত্তেজনা
তবে এটা ঠিক পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক ফলাফল ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে না, তবে নীতি মাঠপর্যায়ে কীভাবে কাজ করবে সেটি নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক অবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এমনকি পানিবণ্টন আলোচনাও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা আবার জটিল হয়ে পড়তে পারে।
হিন্দু সংখ্যালঘু ইস্যু
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের অভিযোগগুলো পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ক্ষমতায় এলে বিজেপি এই ইস্যুকে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে আগেই আভাস মিলেছে। এছাড়াও নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করবে সীমান্ত, পানি, সংখ্যালঘু এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক সবক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সবশেষ
ঢালাও ভাবে পশ্চিমবঙ্গের ফল যে বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক নয় সেটাও বলা যাবে না। কারণ নির্বাচনে ভোটের লড়াই ভোটারের মন পেতে অনেক কিছুই বলতে হয়। কিন্তু মূল নীতি যেহেতু বিজেপি জিতেছে তাই তারা কেন্দ্রের তথা মোদীর নীতিটাই ফলো করে চলবে এটাই বাস্তব।
২০২৬ সালের বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নতুন মোড় দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ দেন। লোকসভা স্পিকার ওম বিরলা রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করও ঢাকা সফর করে গেছেন খালেদা জিয়ার মৃত্যু ইস্যুতে। কেননা অন্তবর্তী সরকারের দীর্ঘ সময় ভারত বার বার বলেছে, তারা বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। সে ধারায় যখন নির্বাচন হয়েছে এবং বিএনপি সরকার গঠন করে তখন থেকে তারা পূর্বের কথা অনুসারে উপরোক্ত আচরণ তারা করেছেন।
যেহেতু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে মোদী সরকারের সখ্যতা ব্যাপক। ফলে আওয়ামী লীগ যাতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারে সে চাপটা ভারত দেবে এটাই প্রত্যাশা ছিল অনেকের। কিন্তু প্রথমত ভারত একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ দিলেও পরে যখন ইউনূস সরকার আওয়ামীলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল, এরপর থেকে আর অন্তর্ভুক্তি ইস্যুটা তারা তোলেনি। এমনকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ওই ইস্যুতে তারা চুপ ছিল। ফলে ভারত সব এড়িয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালই রাখতে চাইছে। তাছাড়া ভূরাজনীতিরই একটা ইস্যু রয়েছে, যেখানে কোয়াড সহ আরো বেশ কিছু ইস্যু রয়েছে। ফলে এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চাইছে এ সময় এটা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।
তাছাড়া ভারতের জন্য একটা শঙ্কার বিষয়ও রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে মতবিরোধ বিভিন্ন কারনে বাড়লে বিএনপি সরকারের জন্য দেশীয় রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করবে। কারণ বিএনপি ইতিমধ্যেই ভারত-বিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে কঠোরপন্থীদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার দিকে ঝুঁকেছে। ফলে বিষয়গুলো ভারত ভালভাবেই দৃষ্টি দিচ্ছে।
এতে করে ভারতের কূটনীতিকরাও মনে করছেন, যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ার পরে বিএনপিই ভারতের স্বার্থ রক্ষার জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প।