২৭ মে ২০২৬, বুধবার, ১১:৪৮:০৬ অপরাহ্ন


তিন মাসেই সরকার ও বিরোধী দলের টানাপোড়েনের বার্তা কী
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৭-০৫-২০২৬
তিন মাসেই সরকার ও বিরোধী দলের টানাপোড়েনের বার্তা কী


বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল যতটা নাটকীয়, ক্ষমতা-পরবর্তী সম্পর্কের রসায়ন অনেক সময় তার চেয়েও জটিল হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে। বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায় জামায়াত ও এনসিপির কিছু বক্তব্যে “ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার” ইঙ্গিত বা আন্দোলনের হুমকি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এতদিন সংযত থাকলেও সম্প্রতি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর বক্তব্যে স্পষ্ট বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি বলেছেন, “আমরা উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। ১৭ বছর আন্দোলন করেছি, রাজপথে থেকেছি, তারপর জনগণের ভোটে দুই শতাধিক আসনে জয়ী হয়ে এখানে এসেছি। আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, আমরাও আন্দোলন করতে জানি।” বিএনপি’র বর্ষিয়ান ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার মাঠের নেতার এই বক্তব্য নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এর ভেতরে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা, যা আগামী দিনের রাজনীতির দিকনির্দেশও দিতে পারে।

কী বলেছিলেন মির্জা ফখরুল 

গত বুধবার (২০ মে) বিকেলে ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদে এক অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে দেশে অঘটন ঘটিয়ে দেওয়া হবে” কিছু রাজনৈতিক দলের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, “আমরা তো উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। নির্বাচন করেছি, নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২১৩টি পেয়েছি। সুতরাং আমাদের ধমক দিয়ে লাভ নেই। ১৭টা বছর আন্দোলন করেছি, জেল খেটেছি, মিথ্যা মামলায় হয়রানি হয়েছি। আমাদেরকে ওই ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরাও রাস্তায় নামতে জানি, রাস্তায় তো ছিলাম। জামায়াতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “জামায়াত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করছে, মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে জামায়াত বিভিন্নভাবে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করতে চায়। এভাবে দেশটা আগাতে পারে না।”

‘২৪ এর আন্দোলনের “মালিকানা” নিয়ে নীরব দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তবতা ছিল আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিগুলো একই প্ল্যাটফর্মে থাকলেও তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, কৌশল ও ভবিষ্যৎ হিসাব এক ছিল না। বিএনপি মনে করে, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, মামলা-হামলা, কারাবরণ, সাংগঠনিকভাবে কোনঠাসা সব কিছুই বিএনপি হজম করে আসছে। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার নৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারও তাদেরই বেশি। এবং মানুষ সেটাই বিচার বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছে। সে মতে তারা এখন ক্ষমতায়। 

অন্যদিকে জামায়াত ও নতুন প্রজন্মভিত্তিক দল এনসিপি মনে করে, জুলাই আন্দোলনে তারা মুখ্য ভুমিকা রেখেছে। ফলে ক্ষমতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা শুধু “সহযোগী” হয়ে থাকতে চায় না; বরং নীতিনির্ধারণে কার্যকর অংশীদারিত্ব চায়। তারা যেটা মনে করে, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে সরকারের অনেক কিছুর বিষয়ে তাদেরও সম্পৃক্ততা থাকবে। কিন্তু জুলাই সনদের সবটা তো বিএনপি বাস্তবায়ন করছে না। এতে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ক্ষোভ তাদের কুড়ে খাচ্ছে। ফলে যেভাবেই হোক চাপ দিয়ে, আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে সরকারকে ব্যস্ত রেখে ফসল ঘরে তোলা। নতুবা ‘২৪ আন্দোলনের ফসল বিএনপি একা কেন ভোগ করবে এ বিষয়টা তারা মানতে পারছে না।

এখানেই দ্বন্দ্বের শুরু

মির্জা ফখরুল অত্যন্ত স্বজ্জন একজন ব্যাক্তিত্ব। সাধারণত সংযত ভাষার রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তিনি সরাসরি সংঘাতমূলক বক্তব্য কম দেন। তাই তার কণ্ঠে যখন “আমরাও আন্দোলন করতে জানি” এ ধরনের বাক্য আসে, সেটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ বক্তব্যে যা প্রকাশ পাচ্ছে সেটা হলো বিরোধী দলকে একরকম সতর্কবার্তা। সরকারে আছে বলেই বিএনপি “নরম” হয়ে যায়নি। প্রয়োজনে রাজপথে সাংগঠনিক শক্তি দেখানোর সক্ষমতা এখনও তাদের আছে সে বিষয়টা স্পস্ট করে দেয়া। এর বাইরেও বিরোধী দলের অতিরিক্ত কথাবর্তা ও কার্যপ্রণালীতে বিএনপি দলীয়ভাবে বেশ কমই রিঅ্যাক্ট করছে। বিএনপির নেতাদের নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য, বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে ফেলে দেয়াসহ বিভিন্ন হুমকি দেয়ার পরও চুপ থাকা ধৈর্যধারণে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক রকম সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। দোটানায় তারা, বিএনপির এমন নীরাবতায়। ফলে মির্জা ফখরুলের ওই বক্তব্য নিজ দলের নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে। 

শুধু বিএনপির অভ্যন্তরে নয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকেও বিএনপির পক্ষ থেকে একটা বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কারণ প্রশাসনে সব দলের মতের লোকজন বিদ্যমান। বিরোধীদের অমন আক্রমণাত্মক বক্তব্যে তারাও হয়তো বিএনপিকে একটা দুর্বল দল হিসেবে ভেবে বসতে পারে। ফলে মির্জা ফখরুল তার দূরদর্শীতা দিয়ে সেটা ঠাহর করেই বার্তা রেখেছেন যে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ভিত্তি কেবল সংসদীয় নয়, রাজপথেও রয়েছে। অর্থাৎ সরকারকে “অস্থায়ী” বা “দুর্বল” ভাবার সুযোগ নেই।

জামায়াত ও এনসিপির কৌশল কী?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত ও এনসিপির সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্যকে সরাসরি “সরকার ফেলে দেওয়ার প্রস্তুতি” হিসেবে দেখার আগে এটিকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখা উচিত। কারণ সরকার গঠনের পর প্রশাসন, নীতি, নিয়োগ, সংস্কার এসব ক্ষেত্রে কার প্রভাব কতটা থাকবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। জামায়াত চাইছে তাদের সাংগঠনিক শক্তির স্বীকৃতি। এনসিপি চাইছে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান দৃশ্যমান করতে। মানুষ যাতে বুঝতে পারে এনসিপি দেশের বড় রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হয়ে উঠছে। এবং ভবিষ্যতে তারাই দেশের ক্ষমতা গ্রহণের জন্য মানুষ তাদের ভোট দেবেন। তাছাড়া বিএনপি যেভাবে তিন মাসে অনেক কিছু করার প্লান পরিক্রমা দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এতে বিরোধী মতের জন্য মানুষের কাছে বিএনপির চেয়ে ভাল কিছু নিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। ফলে বিএনপি সুষ্ঠুভাবে কার্যপ্রণালী যেন করতে না পারে এবং সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মানুষের মনে একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলা যায়-তাহলে ভবিষ্যতের জন্য রাজনীতির মাঠ তাদের জন্য অনুকূল হয়ে উঠবে। 

তাছাড়া বিএনপির অতীত একেবারে ভাল ছিল তাও না। ফলে ১৭ বছর পর বিএনপি নতুন ফর্মূলা গ্রহণ করে দেশ পরিচালনা করলেও পেছনের বিষয়গুলো টেনে আনা ও এ তিন মাসে কোনো চাঁদাবাজি, বা কোনো নেগেটিভ কর্মকান্ড সেটা ছোটো হলেও বড় করে প্রচার করা মানুষের কাছে পৌঁছে দিলে বিএনপি কোনঠাসা হবে। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর জোটভিত্তিক টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। ১৯৯১-পরবর্তী সময়েও বিরোধী ঐক্যের ভেতরে নেতৃত্ব প্রশ্নে দ্বন্দ্ব দেখা গিয়েছিল। ২০০১ সালের পর চারদলীয় জোটের ভেতরেও নীতিগত ও প্রভাবগত টানাপোড়েন ছিল। এমনকি সামরিক-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়গুলোতেও “কে আন্দোলনের মূল শক্তি” এ বিতর্ক সামনে এসেছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ধারারই নতুন সংস্করণ বলাই যায়।

বিএনপি সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ 

বিএনপি সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এক দিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। অন্যদিকে- যে জোট বা বৃহত্তর রাজনৈতিক স্রোতের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্ট সরকারকে পতন ঘটিয়ে পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি একটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে সব শরীকদের অসন্তুষ্ট না করা।

বিএনপির পক্ষে এই ভারসাম্য রক্ষা করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আন্দোলনের সময় “এক প্ল্যাটফর্ম” থাকলেও ক্ষমতায় গেলে প্রত্যেক দল নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জোরালো করতে চায়। ফলে দ্বন্দ এখানেই শুরু। এই ব্যালেন্ডস বিএনপি সরকার কতটা সুক্ষ্নভাবে করতে পারবে সেটা দেখার বিষয়। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক, বিভিন্ন ইউনিভাসিটিসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনেক বিতর্ক তৈরি করতে চাচ্ছে রাজনৈতিক দলসমূহ। অতীতে যে দল ক্ষমতায় তারা তাদের পছন্দসই লোক দ্বারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক বিরোধী দল প্রভাব বিস্তার করে ফ্যাসিস্টের দোসর অ্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লোকজন সরিয়ে পছন্দসই লোককে বসিয়েছে। বিএনপি এখন সেখানে হাত দিলেই বিরোধী পক্ষের অনেকেই সেটা দলীয়করণের তকমা দিয়ে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন। বিএনপি এই স্থানে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলেও বিতর্ক এড়াতে পারছে না। 

বিএনপির জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। যদি অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য বা প্রশাসনিক ইস্যুতে জনঅসন্তোষ বাড়ে, তাহলে মিত্র শক্তিগুলো নিজেদের আলাদা অবস্থান জোরালো করতে রাজপথকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারে। এ দিকে বিএনপি সরকার দৃষ্টি রাখছে বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। 

পরিশেষে 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্দোলনের ঐক্য আর ক্ষমতার ঐক্য এক জিনিস নয়। আন্দোলনের সময় যে দলগুলো একই লক্ষ্য নিয়ে একসাথে থাকে, আন্দোলন সংগ্রাম করে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের স্বার্থ, প্রভাব ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাব আলাদা হয়ে যায়।

এ মুহূর্তে পরিস্থিতি সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে না গেলেও এটুকু স্পষ্ট বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এখনও স্থির হয়নি। আর সেই অস্থিরতার ভাষাই এখন শোনা যাচ্ছে “আন্দোলন”, “রাজপথ” ও “ক্ষমতা” শব্দগুলোর ভেতর দিয়ে। এবং এটা একটি উৎসব মুখর নির্বাচন ও সরকার গঠনের তিন মাসের মাথায়। এটাই এখন শঙ্কার বিষয়! কারণ এ সুযোগ বা আওয়ামী বিরোধী প্লাটফর্মের মধ্যে এত অল্প সময়ের মধ্যে যদি ‘মার মার কাট কাট’ অবস্থা তৈরি হয় এটা মোটেও ভাল কিছু না। বরং এর সুযোগটা তৃতীয় পক্ষ নেয়ার জন্য সুক্ষ্ন পলিটিক্স যে করবে না তারই বা গ্যারান্টি কী। 

শেয়ার করুন