১০ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৪:০৬:০৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ফেডারেল আদালতের রায়ে সুরক্ষিত থাকছে স্ন্যাপ সুবিধা মুসলিমবিরোধী আইন প্রত্যাখ্যানে ১১৯ ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান সেন্ট্রাল পার্কে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখবে ৫০ হাজার দর্শক মামলার কারণে তিন ভাড়াটিয়ার কাছে পাওনা প্রায় এক লাখ ডলার নিউ ইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশি আমেরিকানদের পদোন্নতি নর্থ ক্যারোলিনার স্টেট সিনেটর হলেন বাংলাদেশী হাসিব ফাতমী নিউইয়র্ক স্টেট থেকে ৪৫ হাজার ডলারের চেক পেল বাংলাদেশ সোসাইটি গ্রেস মেংকে পুনরায় নির্বাচিত করার আহবান প্রতিবছর ৭৫ হাজার অভিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে জি কে প্রকল্পের সফলতা ভেস্তে যাবার উপক্রম


এইচ-১বি ভিসায় ১ লাখ ডলারের ফি অবৈধ ঘোষণা
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাতিল করলেন ফেডারেল বিচারক
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৬-২০২৬
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাতিল করলেন ফেডারেল বিচারক এইচ-১বি ভিসা


যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে এক লাখ ডলার ফি আরোপের ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত নীতি বাতিল করে দিয়েছেন ফেডারেল বিচারক। গত ৮ জুন ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল জেলা আদালতের বিচারক লিও টি সোরোকিন রায়ে বলেন, এ ফি মূলত একটি কর আরোপ এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট বা নির্বাহী শাখা এমন কর আরোপ করতে পারে না। ফলে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিটিকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করেন। এ রায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সীমিত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় আইনি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও গবেষণা খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির ওপর এর বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

৪২ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক সোরোকিন বলেন, ১ লাখ ডলারের এই অর্থকে প্রশাসন যেভাবেই বর্ণনা করুক না কেন, এর প্রকৃতি ও বাস্তব প্রয়োগ স্পষ্টভাবে দেখায় যে এটি একটি কর। তিনি লিখেছেন, এখানে এক লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের প্রকৃতি ও প্রয়োগ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে এটি একটি কর, অর্থের নাম যাই দেওয়া হোক না কেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ঘোষণাপত্রে নতুন এ ফি চালু করেন। নীতিমালা অনুযায়ী, নতুন এইচ-১বি ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত এক লাখ ডলার দিতে হতো। সাধারণত এই ব্যয় স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানই বহন করে থাকে। প্রশাসনের দাবি ছিল, এ ব্যয়বহুল ব্যবস্থা কোম্পানিগুলোকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে মার্কিন নাগরিকদের চাকরি দিতে উৎসাহিত করবে।

ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে যুক্তি দেয়, এইচ-১বি কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে অপব্যবহারের শিকার হয়েছে। প্রশাসনের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান এ কর্মসূচির মাধ্যমে মার্কিন কর্মীদের পরিবর্তে কম মজুরির বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ করেছে। তাদের দাবি, নতুন ফি আরোপের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মীর পরিবর্তে দেশীয় শ্রমবাজার থেকে কর্মী নিয়োগে বেশি আগ্রহী হবে। কিন্তু বিচারক সোরোকিন প্রশাসনের সেই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কর আরোপের একচ্ছত্র ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। প্রশাসন ফিটিকে রেগুলেটরি পেমেন্ট বা নিয়ন্ত্রক ফি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেও আদালত মনে করেছে এটি আসলে করেরই একটি রূপ।

রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, প্রশাসন রেগুলেটরি পেমেন্ট বলতে কী বোঝায় তার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দিতে পারেনি। এমনকি এই শব্দগুচ্ছের সমর্থনে কোনো আইন, বিধি বা পূর্ববর্তী আদালতের সিদ্ধান্তও দেখাতে পারেনি। ফলে প্রশাসনের দাবি ছিল ভিত্তিহীন।বিচারক আরো বলেন, নীতিটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং এর আগে কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা বা জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অথচ প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক খাতসহ বহু শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতের ব্যাপক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন তাদের মতামত নেওয়ার সুযোগ দেয়নি।

প্রতি বছর এইচ-১বি কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৮৫ হাজার নতুন ভিসা প্রদান করা হয়। এসব ভিসার মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি পেশাজীবীদের নিয়োগ করে থাকে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গবেষণা, আর্থিক সেবা এবং উচ্চশিক্ষা খাতে এই কর্মসূচির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

এইচ-১বি ভিসাধারীরা সাধারণত তিন বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতি পান। পরবর্তীতে এই অনুমতি নবায়ন করা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই এটি স্থায়ী বসবাসের সুযোগের পথ তৈরি করে। ফলে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের কাছে এই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মজীবন গড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

নতুন ফি চালুর বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে ২০টি ডেমোক্র‍্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্য মামলা করে। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা এবং ম্যাসাচুসেটসের অ্যাটর্নি জেনারেল আন্দ্রেয়া ক্যাম্পবেলের নেতৃত্বে দায়ের করা মামলায় বলা হয়, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি আরো বাড়িয়ে তুলবে। মামলায় উল্লেখ করা হয়, শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক এবং অন্যান্য উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কর্মী সংকট রয়েছে। নতুন ফি কার্যকর হলে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ আরো কঠিন হয়ে পড়বে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রায়ের পর ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা এক বিবৃতিতে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বেআইনি ও ব্যয়বহুল এক লাখ ডলারের কর আদালত বাতিল করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এই কর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে সহায়ক উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের নিরুৎসাহিত করার একটি পদক্ষেপ। নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার এইচ-১বি ভিসাধারী নিউ ইয়র্কবাসীর সেবা করছেন চিকিৎসক, শিক্ষক এবং অন্যান্য দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে। আদালত আজ প্রশাসনের সেই বেআইনি প্রচেষ্টার অবসান ঘটিয়েছে, যা এ গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছিল।

তবে এ ইস্যুতে ফেডারেল আদালতগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও দেখা দিয়েছে। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনের এক ফেডারেল বিচারক বেরিল হাওয়েল ভিন্ন একটি মামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অভিবাসন আইন অনুযায়ী কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে। তাই প্রশাসনের এ পদক্ষেপ আইনসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু বিচারক সোরোকিন তার রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে ২০১২ সালে ওবামাকেয়ার বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলার রায় উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, কর বা আর্থিক জরিমানা আরোপের ক্ষমতা কেবল তখনই বৈধ হয় যখন কংগ্রেস স্পষ্টভাবে সেই অনুমোদন দেয়।

জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়ে না এবং আদালতের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই। তবে বিচারক সেই অবস্থানও প্রত্যাখ্যান করেন। রায়ের পর হোয়াইট হাউস এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ সীমিত করার স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা রয়েছে, যাদের উপস্থিতি তিনি দেশের স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করেন। তিনি জানান, প্রশাসন আপিল করবে এবং তারা বিশ্বাস করে উচ্চ আদালতে এই রায় উল্টে যাবে।অন্যদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক মুখপাত্র বিচারকের সিদ্ধান্তকে বিচারিক সক্রিয়তার উদাহরণ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সংস্কারের লক্ষ্য হলো মার্কিন নাগরিক, শ্রমিক ও পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করা।

উল্লেখযোগ্যভাবে, এ রায়টি এমন সময় এলো যখন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক অভিবাসনসংক্রান্ত পদক্ষেপ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কয়েকদিন আগেই আরেক ফেডারেল বিচারক কর্মসংস্থান অনুমতিপত্র ও অন্যান্য অভিবাসন সুবিধার আবেদন স্থগিত করার প্রশাসনিক নীতি বাতিল করেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচ-১বি ফি সংক্রান্ত মামলাটি এখন আপিল আদালতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পেতে আরো সময় লাগতে পারে। তবে আপাতত ফেডারেল আদালতের এ রায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও গবেষণা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শেয়ার করুন