১৭ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৬:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


টেক্সাস রিপাবলিকান কনভেনশনে বিভাজন ও উত্তেজনা
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৭-০৬-২০২৬
টেক্সাস রিপাবলিকান কনভেনশনে বিভাজন ও উত্তেজনা টেক্সাস রিপাবলিকান কনভেনশন


যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরে, জর্জ আর. ব্রাউন কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ২০২৬ টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টি স্টেট কনভেনশন শেষ হয়েছে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং আদর্শগত সংঘাতের মধ্য দিয়ে। গত ১২ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত চলা এ তিনদিনের সম্মেলনের শুরুতে দলীয় নেতারা ঐক্যের বার্তা দিলেও শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পড়ে প্রকাশ্য বিরোধ, হট্টগোল এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মাধ্যমে। সম্মেলনের শুরুতে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিক এবং সিনেটর টেড ক্রুজ বারবার ঐক্যই জয় বার্তা দেন এবং ডেমোক্র‍্যাটদের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক লড়াইয়ের আহ্বান জানান। তবে ভেতরের আলোচনায় রিপাবলিকান পার্টির দুই ধারার মধ্যে প্রতিষ্ঠানপন্থী নেতৃত্ব এবং আরো কট্টর রক্ষণশীলদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি ছিল দলীয় চেয়ারম্যান আব্রাহাম জর্জকে ভোটে অপসারণ করা। অভিযোগ ছিল, তিনি দলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তার জায়গায় ডি’রিন্ডা র‍্যানডাল নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি আগে ভাইস চেয়ার ছিলেন এবং এখন দল পুনর্গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন। জর্জ পরাজয় স্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অধিবেশন পরিচালনা চালিয়ে যান এবং সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

সম্মেলনে টেক্সাস হাউস স্পিকার ডাস্টিন বারোজ প্রথমবারের মতো রিপাবলিকান পার্টি কনভেনশনে বক্তব্য রাখেন, যা ঐতিহাসিক হলেও অনেক প্রতিনিধি তাকে বু দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়। এটি দেখায় যে আইনসভায় রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও দলের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।সম্মেলনের আরেকটি বড় রাজনৈতিক বিভাজন দেখা যায় সিনেটর জন কর্নিন ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। প্যাট্রিক প্রকাশ্যে কর্নিনকে সোর লুজার বলে মন্তব্য করেন, যা পরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তোলে।

নীতিগত আলোচনায় সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু ছিল অভিবাসন ও ধর্মীয় বিষয়। শরিয়া ল নিয়ে কঠোর অবস্থান, স্কুলে ধর্মীয় প্রার্থনার সময় নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার প্রস্তাবগুলো ব্যাপক সমর্থন পায়। সম্মেলনে ‘শরিয়া-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ নামের একটি নতুন গ্রুপ সক্রিয়ভাবে প্রচার চালায়, যা মুসলিম সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নেয়।

একই সঙ্গে রিপাবলিকান প্ল্যাটফর্মে আরো কিছু কঠোর প্রস্তাব যুক্ত হয়: যেমন স্কুলে শরিয়া আইনকে মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা, অভিবাসীদের ওপর কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় সরকারের তুলনায় রাজ্য সরকারের ক্ষমতা বাড়ানো।

অন্যদিকে সম্মেলনে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো বিষয়েও বিতর্ক দেখা যায়। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, স্থানীয় ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং টেক্সাসের দ্রুত শিল্পায়ন নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন, আবার অনেকে ফেডারেল ও রাজ্য অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ শিথিল রাখার পক্ষে অবস্থান নেন।

সম্মেলনে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রিপাবলিকান পার্টির সামগ্রিক আদর্শগত পরিবর্তন। দলটি ক্রমেই আরো ডানপন্থী অবস্থানে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত। নতুন প্ল্যাটফর্মে স্কুলে খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ জোরদার করা, ধর্মীয় ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা এবং ‘ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার’ ধারণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া প্ল্যাটফর্মে প্রস্তাব করা হয়েছে স্কুলে ‘টেন কমান্ডমেন্টস’ প্রদর্শন এবং প্রার্থনার সময় পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার মতো নীতিগত পরিবর্তন, যা ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। টেন কমান্ডমেন্টস বা দশ আজ্ঞা হলো বাইবেলে উল্লিখিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও নৈতিক নির্দেশনার সমষ্টি, যা ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মে মৌলিক বিধান হিসেবে বিবেচিত হয়। এ নির্দেশনাগুলো মূলত ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের একে অপরের প্রতি আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করে। এতে বলা হয়েছে, একজন মানুষকে একমাত্র ঈশ্বরের উপাসনা করতে হবে, অন্য কোনো দেবতা বা মূর্তির পূজা করা যাবে না এবং ঈশ্বরের নামের অপব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি সাপ্তাহিক বিশ্রামের দিনকে সম্মান করা, বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করা, হত্যা না করা, ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা, চুরি না করা, মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়া এবং অন্যের সম্পদ বা জিনিসের প্রতি লোভ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও এ ১০টি নীতি অনেক সমাজে নৈতিক আচরণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

সব মিলিয়ে, এই কনভেনশন টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি তার গভীর বিভাজনকেও সামনে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে এ মতবিরোধ দলটির কৌশলগত ঐক্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শেয়ার করুন