০৯ জানুয়ারী ২০২৬, শুক্রবার, ০৮:১৫:১৮ অপরাহ্ন


দেশমাতা খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩১-১২-২০২৫
দেশমাতা খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ খালেদা জিয়া


শত ঝড়ঝঞ্ঝায় বাংলাদেশের মানুষের কাছে যিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক, শত্রুপক্ষও যার নীতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন, বাংলাদেশ যার হাতে ছিল সবচে নিরাপদ, দেশের স্বার্থ যেখানে বিঘ্ন হয়েছে সেখানেই ঝাপিয়ে পড়তেন প্রতিবাদে, নিজের শত বিপদ তবু ছাড় দিতেন না দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিঘ্ন হওয়া কোনো ইস্যুতে, সেই মহীয়সী নারী আর কেউ নন, বেগম খালেদা জিয়া। 

সবাইকে কাঁদিয়ে হাসতে হাসতেই যেন চলে গেলেন গণতন্ত্রের ‘মা’ দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। দলমত নির্বিশেষে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা ৮০ বছর বয়সী আপোষহীন এ নেত্রী রাজধানী ঢাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ( বাংলাদেশ সময়) গত ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। তাঁর এমন মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলাদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশীদের মাঝে। শোকের মাতমে পাথর বনে যান যেন তারা। খালেদা জিয়ার মৃত্যু রাজনীতিতে সৃষ্টি হলো বড় শুণ্যতা। যা অপুরণীয়। দেশে ভরসা করার মত যে কজন পরীক্ষিত নেতৃত্ব ছিল, তা কমতে কমতে এক খালেদা জিয়া ছিলেন অবশিষ্ট। দেশের বিপদ আপদে, অভ্যন্তরেও নানা জটিলতার সমাধানে মুরব্বির ভূমিকায় ছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনীতিবিদরা সমাধান খুঁজতে তার কাছেই হাজির হতেন। সেটা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসও। দেশকে একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের কবল থেকে মুক্ত করে, দীর্ঘ ১৭ বছরের লড়াই শেষে আবারও দেশকে গণতন্ত্রের ট্র্যাকে তুলে দিয়ে খালেদা জিয়া যেন হাসতে হাসতে চলে গেলেন মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়া দিয়ে। 

মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সুচনালগ্নেও এক ক্রিটিকাল অধ্যায় উপনীত হয়। ওই অধ্যায়ের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের হাল ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ঠিক তখনই শত্রুপক্ষের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হন জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। মহান এ নেতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে গৃহবধু থেকে হাল ধরেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির। শুরু হয় খালেদা জিয়ার শহীদ জিয়ার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। 

পিছপা হলেন না একটুও। সবার আগে দেশ ও গণতন্ত্র। এ জন্য বিন্দুমাত্র ছাড় নেই- এটাই ছিল খালেদা জিয়ার আদর্শ, নীতি। লড়াইয়ে সফল হয়েছেন, কখনও দমিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু পিছপা হননি। খালেদা জিয়ার এ অদম্য লড়াইয়ে তাকে উপাধী দেয়া হয় আপোষহীন। 

দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য সেই লড়াইয়ে পাঁচবার জেল খেটেছেন। হারিয়েছেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে। জেল জুলুমের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা খালেদা জিয়া দমে যাননি। অন্যায়ভাবে তাকে জেলে ঠেলে দেয়া হয়, উপায়ন্ত না দেখে কুচক্রী মহল ক্ষমতার প্রস্তাবও দেন অগণান্ত্রিকভাবে। রাজি হননি। এরপর নেমে আসে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন। মিথ্যা অভিযোগে ক্ষতবিক্ষত হন তার বড় ছেলে তারেক রহমান। প্রস্তাব আসে বিদেশে চলে যাবার। এবারও রাজি হননি। বলেছেন, আমার দেশ, আমার মাটি এ বাংলাদেশ। আমার বিদেশে কোনো ঠিকানা নেই ঘর নেই। আমি দেশের নীপিড়িত নির্যাতিত মানুষকে রেখে যাব না। মৃত্যু হলে দেশের মাটিতেই হবে। হুমকি দেয়া হয় ফ্যামিলি ধ্বংসের। পাত্তা দেননি। বলেছিলেন এই দেশের মানুষই আমার ফ্যামিলি। স্বামী জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে মিথ্যা অজুহাতে এক কাপড়ে বের করে দেয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে চোখের পানিতে ভাসিয়েছেন। অপমানিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগ করেন তাকে বাড়ি থেকে বের করতে অকথ্য ভাষাও ব্যবহার করা হয়। নানা প্রস্তাবনা আসে। কিন্তু দুই সন্তান, ফ্যামিলির চেয়েও খালেদা জিয়ার ছিল দেশ, মাটি ও মানুষের জন্য টান। ভালবাসা। কোথাও যাননি। 

তাইতো সূচনাই যার মুক্তিযুদ্ধে বিশাল ত্যাগের মধ্যদিয়ে। তিনি কী গণতন্ত্র, দেশ ও দেশের মাটির সঙ্গে আপোষ করবেন? স্বাধীনতার ঘোষক যার স্বামী, নিজেও মুক্তিযুদ্ধে বড় অবদান রাখা এক ব্যাক্তিত্ব, তাই খালেদা জিয়া কখনই আপোষ করেননি। তার এ বীরারোচিতার জন্য দেশের মানুষের কাছে ভালবাসায় সিক্ত। দলমত নির্বিশেষে আজ খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ায় অশ্রু। এমন প্রস্থান ক’জনের ভাগ্যে বা জুটে। তার এমন গণতন্ত্রের লড়াইয়ের জন্য শুধু যে দেশে তাই নয়, উপমহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বে এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। 

খালেদা জিয়ার স্বহাস্য প্রস্থান

জন্ম নিলেই মৃত্যু। কিন্তু এমন মৃত্যু ক’জনেরই বা হয়। বিশ্বের রাজনৈতিক বহু সফল নেতাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু সম্মানের সাথে, দেশের মাটিতে সম্মানের সঙ্গে চিরবিদায় নেয়া- একটু বিরল ঘটনা, বিশেষ করে উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের। এরপর সংসদে বিরোধী দলের আসনেও ছিলেন দুই বার। কিন্তু কখনই তিনি অসম্মানিত হননি। তাকে মিথ্যা সব অভিযোগে কারাবাস করতে বাধ্য করা হলেও দেশের কোটি কোটি মানুষ ছিলেন তার সঙ্গেই। পারেনি বেশীদিন আটকে রাখতে। সর্বশেষ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও তাকে দীর্ঘদিন কারাবাসে রাখেন। পরবর্তিতে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিজ বাসায় শর্তসাপেক্ষে থাকতে দেয়ার পর হাসপাতাল ও বাসায় ছিল তার যাতায়াতের গন্ডিতে। অন্তত ৫ থেকে ৬টি জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। এরমধ্যে লিভার সিসোসিস, কিডনি, হার্ট এ সমস্যা, ডায়বেটিসসহ নানা জটিল রোগ। এসবের চিকিৎসা নিতেই তিনি যান হাসপাতালে। মৃত্যুর আগে তার একটা বাসনা ছিল- শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী ফ্যাসিস্টের পতন দেখার। সেটাও তিনি দেখে গেছেন। এ পর্যন্ত তিনি যেসব ভবিষ্যতবাণী করে গেছেন নির্যাতিত হয়ে। তার সব কটিই অক্ষরে অক্ষরে কবুল করেছেন মহান রাব্বুল আলামীন। 

বিরোধী দলীয় নেতা হয়েও ফ্যাসিস্টদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ্য হয়ে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, জনগণ জেগে উঠলে পালানোরও পথ থাকবে না। দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। সেটাই হয়েছে। বলেছিলেন, একদিন কাঁদতে হবে। কাদতে কাঁদতে..। নির্বাসনে থেকে দেশের জন্য শেখ হাসিনা কাঁদছেন বৈকি! ভারতে এমন এক গোপনস্থানে তাকে রাখা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা দিয়ে, যেখান থেকে তিনি না পারছেন কারোর সঙ্গে কথা বলতে, বা না পারছেন কেউ দেখা করতে। 

তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। একদিন তারেক বাংলাদেশে আসবে বীরের বেশে। বাংলাদেশের মানুষ তারেকের প্রতীক্ষায় থাকবে। খালেদা জিয়া নিজ চোখেই সেটা দেখে গেলেন। যে অনেকটা রাজনৈতিক নেতৃত্বশুণ্য দেশে তারেকের ফিরে আসার জন্য কোটি কোটি মানুষের সে কি প্রত্যাশা, প্রতীক্ষা। দেখলেন গণতন্ত্র হরণকারী, ফ্যাসিস্টের পতন, দেশ ছেড়ে পালায়ন, তার ছেলে তারেক রহমানের বীরের বেশে প্রত্যাবর্তন। 

মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও ফিরে পেয়েছেন তিনি। যা বিগত আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। জুলাই আন্দোলনে দেশ ছেড়ে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পতনের পর দুইবার খালেদা জিয়াকে সম্মানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠানে মর্যদার সঙ্গে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্মানিত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক দেশের ‘সবচে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব’ ঘোষণা করে খালেদা জিয়াকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এসএসএফ এর নিরাপত্তা প্রদান করেও সম্মানিত করা হয়। 

অপূরণীয় ক্ষতি বাংলাদেশের 

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেকটাই নেতৃত্বশুণ্য এখন। দেশ চালাতে পরীক্ষিত সকল নেতা এক করে প্রস্থান করেছেন। অবশিষ্ট ছিলেন খালেদা জিয়া। তারও প্রস্থানে দেশ এক রকম নেতৃত্বশূন্য। তার অবর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির হাল ধরেছেন বড় ছেলে তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসন কাটিয়ে সবে দেশে ফিরেছেন। সবকিছু গুছিয়ে ‘মা’ খালেদা জিয়ার কাছ থেকে সব বুঝে নিবেন, সেটা আর হলো না তার। এসেই মা’র কাছে ছুটেছিলেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। কতটা কুশল বিনিময় হয়েছে সেটা জানা না গেলেও ওই সাক্ষাত যে অপর্যাপ্ত সেটা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বুঝা যায়। 

আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনেও খালেদা জিয়া অন্তত তিন আসনে লড়বেন, সোমবার দাখিল করা হয়েছে মনোনয়নপত্রও। কিন্তু সেখানে স্বাক্ষর করতে পারেননি। দিয়েছেন টিপ সই। তখনই ধরে নেয়া হয়েছিল, হাসপাতালের বারান্দায় বহুবার গেলেও এবার আর পূর্বের যে কোনো এক সময়ের মত সেই হাসিমাখা মুখখানা আর দেখা মিলবে না! হলোও তাই। হাসপাতাল থেকে বের হয়েছেন ঠিকই সেটা তার ঠিকানা ফিরোজায় নয়, মানিক মিয়া এভিউনিউতে তার জন্য নির্ধারিত জানাজার জন্য। এরপর চিরদিনের জন্য শায়িত হলেন তিনি স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে।

শেয়ার করুন