ফাইল ছবি
নানা সমস্যা সংকটের বেড়াজাল পেরিয়ে শেষ স্টেশনে পৌঁছানোর যাত্রা পথে এখন নির্বাচনী ট্রেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দলটির সরকার ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত একটানা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। জুলাই আগস্ট আন্দোলনে ক্ষমতা হারানো দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক। অনেক নেতা আটক হয়ে কারাবন্দি। বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে বিচার কার্য চলমান। অস্বীকার করার উপায় নেই দলটির কিন্তু তৃণমূলে এখন বিপুল সংখ্যক জনসমর্থন আছে।
কোনো আদালত কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। একটি অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে একটি রাজনৈতিক দলকে জাতীয় নির্বাচনের বাইরে রাখা সংবিধান সম্মত কিনা তা নিয়ে মতবিরোধ আছে।
যাহোক, আওয়ামী লীগের অবর্তমানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামাতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। বিএনপি এবং জামায়াত আবার দীর্ঘদিনের নির্বাচনী সঙ্গী, ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত সরকারের অংশীদার।
পরিস্থিতির কারণে দুদলের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য সৃষ্টি মূলত দুটি দল আওয়ামী লীগ এবং ভারত বিরোধী। এমনি যখন অবস্থা তখন নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ হবে কি না সেটি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। এবারে আবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংস্কার বিষয়ে গণভোট।
এখন প্রশ্ন হলো, দেশে কিন্তু সংবিধান বহাল আছে। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচন কোন অনির্বাচিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান নেই। আর সংবিধানে গণভোটেরও কোনো বিধান নেই। ইতিমধ্যে উপরোক্ত দুটি বিষয়ে আদালতে রিট করা হয়েছে। নানা বিদেশি গোষ্ঠীর তরফ থেকে নির্বাচন অংশীদারমূলক করার পরামর্শ আছে।
এদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইচ্ছুক প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে নমিনেশন জমা দেয়ার পর প্রাথমিক বাছাইতে বাদ পড়া প্রার্থীদের আপিল বিবেচনা চলছে। ২২ জানুয়ারি ২০২৬ এই পর্ব শেষ হবার পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। শুরু হবে পূর্ণমাত্রায় প্রচার অভিযান। রাজনীতি ঘিরে ইতিমধ্যে কিছু সাড়া জাগানো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ নিয়ে চলছে কঠোর প্রতিবাদ। প্রতিবাদীরা হত্যাকাণ্ডের বিচার নির্বাচনের আগেই চাইছে। কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার চলছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। সাধারণ মানুষ নানা শঙ্কায়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষই সরকারের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। অনেকের ধারণা সরকার লেভেল প্লে গ্রাউন্ড প্রস্তুত করতে পারেনি। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসবে, ততই সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে কারণে-অকারণে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ায় বাড়তি সংকটের পথে বাংলাদেশ। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন নাজুক। এমতাবস্তায় বাংলাদেশে নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হবে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচনে কিন্তু একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করেছে জামাতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। যদিও জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ ভিন্ন। তবুও এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটার, প্রান্তিক ভোটার মহিলা ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে নাটকীয় কিছু হতেও পারে।
কিন্তু দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি কিন্তু আদর্শ নয়। ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকারকে কিন্তু অস্তিত্বের জন্য সবাইকে নিয়ে কঠিন সংগ্রাম করতে হবে। বিএনপির দীর্ঘ নির্বাসনে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর পরে দেশে ফিরে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন। তাকে ঘিরে নয়া মেরুকরণ চলছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নির্বাচনী ট্রেন আপন গতিতে শেষ স্টেশনে পৌঁছাক। নির্বাচনী ট্রেন যেন লাইনচ্যুত না হয়। জনগণ অবাধ নিরপেক্ষ পরিবেশে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করুক। নির্বাচন নিয়ে যেন সূক্ষ্ম বা স্থুল কারচুপির কোনো অভিযোগ না আসে। তবে এখনই বলে রাখছি, হয়তো নির্বাচিত পার্লামেন্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের পর পরবর্তী সরকারের মেয়াদে হয়তো আরো একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে হতেও পারে।