১৭ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৩:৫৯:১৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ধাক্কা খেল ব্রাজিল, জয় পেল ফ্রান্স জার্মানি আমেরিকা আর্জেন্টিনা আদালতের নির্দেশে পুনরায় আশ্রয় ও অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করতে সম্মত ট্রাম্প প্রশাসন আটক অভিবাসীদের জামিন শুনানি নিয়ে রায় দেবে সুপ্রিম কোর্ট ক্রীড়াপ্রেমী তারেক রহমান ইংল্যান্ডের সাপোর্টার ডাকা সুবিধাভোগীদের আটক ও বহিষ্কারের ঝুঁকি বাড়ছে হোম কেয়ারে ব্যাপক দুর্নীতি : পিপিএল-স্টেটের বিরুদ্ধে মামলা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব ফেডারেল আদালতের রায়ে সুরক্ষিত থাকছে স্ন্যাপ সুবিধা মুসলিমবিরোধী আইন প্রত্যাখ্যানে ১১৯ ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান সেন্ট্রাল পার্কে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখবে ৫০ হাজার দর্শক


মসজিদে হুমকি দেওয়ায় রবার্ট উইলিয়ামের ১৮ মাসের কারাদণ্ড
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৪-২০২৬
মসজিদে হুমকি দেওয়ায় রবার্ট উইলিয়ামের ১৮ মাসের কারাদণ্ড সাজাপ্রাপ্ত রবার্ট উইলিয়াম মিলার


যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি স্টেটের চাটানুগা শহরে স্থানীয় মসজিদ ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার চাটানুগার ভেতরে ঢুকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রবার্ট উইলিয়াম মিলার নামে এক ব্যক্তিকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। আদালতের রায়ে শুধু কারাদণ্ডই নয়, বরং অভিযুক্তকে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারাভোগ শেষে তাকে তিন বছরের জন্য পর্যবেক্ষণমূলক মুক্তিতে রাখা হবে।

অভিযুক্ত রবার্ট উইলিয়াম মিলার (৫০) গত বৃহস্পতিবার ফেডারেল আদালতে হাজির হলে বিচারক চার্লস ই. অ্যাটচলি জুনিয়র তার বিরুদ্ধে এই সাজা ঘোষণা করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এটি ছিল নির্দেশিকা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সীমার সাজা। বিচারক তার দীর্ঘদিনের উদ্বেগজনক ও অস্থির আচরণ বিবেচনায় এনে এ কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

সাজা ঘোষণার দিন আদালত কক্ষে একটি আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সকাল প্রায় ১০টার দিকে ইসলামিক সেন্টারের কয়েকজন সদস্য আদালতের গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন। তারা সরাসরি পুরো শুনানি প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় মিলারকে হাতকড়া ও পায়ে শেকল পরানো অবস্থায় আদালতে আনা হয় এবং তিনি একটি নীল রঙের বন্দি পোশাক পরিহিত ছিলেন।

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী শুনানিতে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাদের যুক্তি তুলে ধরেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে দুজন প্রভাব বিবৃতি প্রদান করেন। শেষে অভিযুক্ত নিজেও আদালতের কাছে বক্তব্য দেন। নিজের বক্তব্যে মিলার প্রথমেই তার শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তিনি ত্বকের ক্যানসারে ভুগছেন এবং মদ্যপানের সমস্যাও রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি নিয়মিত মদ্যপান করেন এবং নিজের ভাষায় মারিজুয়ানা মদ থেকে ভালো মনে করেন। তিনি আদালতের উদ্দেশে বলেন, আমি জানি না কী বলবো, মাননীয় বিচারক, আমি দুঃখিত। তবে বিচারক তার এ ক্ষমাপ্রার্থনাকে যথেষ্ট মনে করেননি। তিনি বলেন, মিলারের অতীত আচরণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং তার জীবনব্যাপী অস্থির ও অশালীন কর্মকাণ্ডের ইতিহাস রয়েছে।

বিচারক অ্যাটচলি বলেন, অভিযুক্তের আচরণ অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক। তিনি আরো উল্লেখ করেন, তার দেখা সবচেয়ে অশোভন ও অস্থির আচরণের মধ্যে এটি অন্যতম। বিচারক বলেন, এ ধরনের হুমকি শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো একটি সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করে। এ সাজা এমন অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তিনি আরো বলেন, আদালতের উদ্দেশ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, বরং অভিযুক্ত যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মিলারের আইনজীবী হেনরি আদালতে দাবি করেন, তার মক্কেল কখনোই বাস্তবে এ হুমকি কার্যকর করার উদ্দেশ্য রাখেননি। তিনি বলেন, সে একটি মাছিকেও ক্ষতি করবে না। আইনজীবী আরো জানান, মিলার অল্প বয়স থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনি হাইস্কুল শেষ করতে পারেননি এবং দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথম মারিজুয়ানা ব্যবহার শুরু করেন এবং ১৭ বছর বয়সে সাইকেডেলিক ড্রাগ গ্রহণ করেন। এছাড়া মিলারের আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এবং অতীতে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলেও আদালতে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিরক্ষা পক্ষ দাবি করে, এ হুমকি ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং রাজনৈতিক বা তুচ্ছ কারণ থেকে এসেছে। তারা বলেন, মিলার নিজেকে ‘অ্যাথেইস্টিক স্যাটানিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন, যার অর্থ তিনি শয়তানকে পূজা করেন না, বরং এটি কর্তৃত্ববিরোধী প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। আইনজীবী বলেন, আমরা যেভাবে স্যাটানিজমকে ভাবি, বাস্তবে তা সেরকম নয়। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না।

তবে বিচারক এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা শতভাগ নিশ্চিত, কিন্তু সেই স্বাধীনতার আড়ালে অন্যদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, সে কী বিশ্বাস করে বা করে না, তা আদালতের বিষয় নয়। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

ফেডারেল প্রসিকিউটর ক্রিস পুলে বলেন, এ হুমকিকে তুচ্ছ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ইসলামিক সোসাইটির সদস্যরা জানতেন না মিলার সত্যিই এ হুমকি বাস্তবায়ন করবেন কি না। তিনি বলেন, এ হুমকি তাদের মনে যে ভয় সৃষ্টি করেছে, তা বাস্তব এবং গভীর।

আদালতে ইসলামিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আমানি শোরবাজি, যিনি একই ভবনে অবস্থিত একটি স্কুলের প্রধান বলেন, এ হুমকি তাদের নিরাপত্তাবোধ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দেয়। তিনি জানান, তাদের স্কুলে ১২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে এবং অধিকাংশ শিক্ষক নারী। হুমকির পর তারা বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হন, যার মধ্যে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও গেট স্থাপন অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, আমি সবসময় ভয়ে থাকতাম, যদি কিছু ঘটে যায়?

ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার চাটানুগার সভাপতি আবদুল-হাফিজ এল-এত্র বলেন, এই ঘটনার পর কেন্দ্রটিতে উপস্থিতি কমে যায় এবং নিরাপত্তা ব্যয় বেড়ে যায়, যা তাদের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এটি একটি সন্ত্রাসী হুমকির মতো মনে হয়েছে।

২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মিলার একটি জিমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ইসলামিক সোসাইটিকে একটি ইমেইল পাঠান। সেই ইমেইলে তিনি লিখেছিলেন, আমি তোমাদের সবাইকে হত্যা করব, হেইল স্যাটান। এ ইমেইলটি পরদিন এফবিআইতে রিপোর্ট করা হয়। তদন্তে জানা যায়, ইমেইলটি একটি স্থানীয় বার ব্রু অ্যান্ড কিউয়ের ওয়াই ফাই ব্যবহার করে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে মিলার বসবাস করতেন।

চাটানুগার এ ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি সমাজে বিদ্যমান বিদ্বেষ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অনলাইন ঘৃণামূলক আচরণের একটি জটিল প্রতিফলন। আদালত এ মামলায় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা একদিকে যেমন আইনের কঠোর প্রয়োগের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে তেমনি অভিযুক্তের পুনর্বাসনের দিকেও নজর দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে শুধু আইন প্রয়োগই নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সচেতনতা এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। এ রায় হয়তো একটি মামলার সমাপ্তি, কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতায় এটি একটি চলমান চ্যালেঞ্জের অংশ হিসেবেই রয়ে গেছে।

শেয়ার করুন