০৭ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:৩৮:৪৫ অপরাহ্ন


যুগের পর যুগ তিস্তা খনন না করার খেসারত
তিস্তায় জমছে বালু, বাড়ছে ভাঙ্গন, দেখা দিচ্ছে পানি সঙ্কট
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
তিস্তায় জমছে বালু, বাড়ছে ভাঙ্গন, দেখা দিচ্ছে পানি সঙ্কট ছবি/ দেশ ইউএস


যুগের পর যুগ তিস্তার বুকে পলি-বালু জমছে। এরফলে নদী বুক তার পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। নদীর বাংলাদেশের উজানের ডালিয়া থেকে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি পর্যন্ত নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এতে করে তিস্তার আশে পাশের প্লাবন ও কৃষি জমি এখন নদীর চেয়ে নিচু হয়ে গেছে। ফলে উজান থেকে একটু বেশি পানি বাড়লেই নদীর দুই তীর তীব্র ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে। 

এসব তথ্য জানা গেছে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির উদ্যোগে তিস্তা নদী ওপর সরজমিনে পরির্দশনে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় নদী ও পরিবেশবিদদের সাথে কথা বলে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং এর বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ে সোচ্চার একটি সংগঠন। সরজমিনে পরিদর্শনের আগে রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সংগঠনটির উদ্যোগে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং এর আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি) চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশের সভাপতি মোন্তফা কামাল মজুমদার, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম এবং এবং আইএফসি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম আজাদ এবং ট্রাস্টি ঢাকার শেকড়ের সবুজায়ন ও সামাজিক সংগঠনের মোতালেব মাশরাকি উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে নদী রক্ষা করা অপরিহার্য। নদী কেবল পানির উৎস নয়, বরং এটি দেশের প্রাণশক্তি, অর্থনীতি এবং বাস্তুতন্ত্রের ধারক। দেশ ও অস্তিত্ব রক্ষা: নদী হলো বাংলাদেশের হৃৎপিন্ড। নদী না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়বে। এ প্রসঙ্গে তারা বলেন, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিনের, বিশেষ করে তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। এই বিষয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দাবি উত্থাপিত হয়েছে। সাংবাদিকদেরও এব্যাপারে দাবি জানিয়ে লেখনী জোরদারের আহবান জানান তারা। 

সরজমিনে গিয়ে যা দেখা গেলো

এদিকে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীটি বাংলাদশের যে অংশ দিয়ে তিস্তা নদীর ভাটি অঞ্চল বা ভাটি এলাকা বিশেষ করে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডালিয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা নেই বললেই চলে। নদীর অনেক স্থানে পাহাড় সমান পলি-বালুর স্তুপ। এতে করে বিশাল নদীর পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। নদীর তলদেশে পলি জমে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় পানির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে পাড় ভাঙ্গনের মুখেই পড়ছে। জানা গেলো পলি জমে থাকার কারণে নদীর তীর ভাঙ্গনের মুখে পড়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বর্ষাকালে বন্যার কারণে আশেপাশের লোকালয় প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এলকার জনগণের মতে, কেননা নদীর সৃষ্ট থেকেই নদীর তলদেশে পলি জমছেই। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের একটি সূত্র থেকে জানা গেলো যে, তিস্তা ব্যারাজের বাংলাদেশের উজানে ৫০০ মিটার এবং ভাটিতে ৫০০ মিটারে আনুমানিক ১২২০০০০ ঘনমিটার পলি জমি আছে।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল লতিফ খান দেশ প্রতিনিধি জানান, তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরের জেলা নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়শিংহেশ্বর মৌজা দিয়ে প্রবেশ করেছে। এই উপর ডালিয়া নামক স্থানে দেশের সর্ববৃহৎ কৃষি সেচ প্রকল্লেরর ব্রীজ রয়েছে। এই ব্রীজের উজানের মানুষগুলো সেচের কোন প্রকার সুবিধা পায় কিন্তু এরা তিস্তা নদী দ্বারা শুধু ক্ষতির স্বীকারই হন। প্রতি বছর ঝাড়শিংহেশ্বর, পূর্ব ছাতনাই, দোহল পারা, কিসামত ছাতনাই, উত্তর খড়িবাড়ী, চর খড়িবাড়ী, টাপুর চর, ছোটখাতা এই সকল এলাকার জনসাধারণ নদী ভাংগনের কবলে পড়ে বসত বাড়ি হারা হয়ে ওয়াপদা বাধের উপর অসহায়ের মত জীবন যাপন করছে। মাঝে মাঝে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল এসে নদীর নাব্যতা এমনভাবে কমে গেছে যেন নদীর গভীরতা কমে জমির চেয়ে উঁচু হয়েছে। নদী থেকে বালি অপসারণ না করলে সামনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

এব্যাপারে যিনি তিস্তার বাঁধ প্রকল্পের ইরিগেশন ও ড্রেনেজ সিস্টেম ডিজাইনকারী ছিলেন সে-ই প্রকৌশলী মোঃ বেলায়েত হোসেন দেশ প্রতিনিধিকে বলেন, নিয়মিত খাল ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চালু রাখতে হবে।

তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ফরিদুল ইসলাম ফরিদ দেশ প্রতিনিধিকে বলেন, পানি বাড়লেই তিস্তার বাম তীরের বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এর উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হচ্ছে গঙ্গাচরা উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের মিনার বাজার খেয়াঘাট, ব্রীফ বাজার খেয়া এবং বাম তীরে তিস্তার একটি ছড়া নদীর আশ্রয়ান বাজার সংলগ্ন স্থানে। কোলকোন্দ ইউনিয়নের গঙ্গা খাওয়া ঘাট সংলগ্ন, উপজেলার লক্ষীটারি ইউনিয়নের ব্রীজের সংলগ্ন বাঁধের মাথা এবং ব্রীজের ডাউনে মোজা চলি¬শ সাল নদীর (বাম তীর) ইতিমধ্যেই ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এসব ভাঙ্গনের মূল কারণ নদী নাব্যতা সংকট ও অবৈধ বালু উত্তোলন। তিনি বলেন, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলাধীন নাজিমখান ইউনিয়নের হাসারপাড় নামক স্থানে ব্যাপক ভাঙ্গনের মুখে পড়ে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এবারো পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে নদীর উত্তর দিকে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা স্পারের সামনে এবং পিছনে সদরের কালমাটি পাকার মাথার সামনের দিকে আর দক্ষিণ দক্ষিণে লালমনিরহাট সদরের রাজপুর, খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ডান তীরে হরিনচড়া নামক স্থানসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙ্গন প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও নীলফামারী জলঢাকা ও লালমনিরহাট জেলা হাতিবাদ্ধ উপজেলা বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গন প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এর বক্তব্য

এদিকে ব্যারাজের বাংলাদেশ অংশের উজানে ও ভাটিতে পলি অপসারণে কি কি পরিকল্পনা আছে জানতে চাওয়া হয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরীর কাছে। আমেরিকা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধিকে তিনি জানান, ব্যারাজের উজানে ও ভাটিতে পলি অপসারণে “তিস্তা ব্যারাজের উজানে ড্রেজিং এর মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি সম্পদের সংরক্ষণ ও যথার্থ ব্যবহার” শীর্ষক প্রকল্প দাখিল করা হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তাা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে পরি অপসারণ করা হবে। এছাড়াও তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুর্নবাসন ও সম্প্রসারণ নামক প্রকল্পের আওতাও একটি ড্রেজার কেনার জন্য টেন্ডার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত ভাবে ড্রেজিং এর মাধ্যমে পলি অপসারণ করা হবে। 

নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী আরও জানান যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নদী ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পলি ব্যবস্থাপনা করছে, যার মধ্যে ১৯৭২ সাল থেকেই ড্রেজার সংগ্রহের ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদী খনন ও পলি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত। সাম্প্রতিক সময়ে নদীর নাব্যতা রক্ষায় বিগত ১০ বছরে ২৫টি ড্রেজার সংগ্রহের পাশাপাশি নদী নিয়ে ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ২০২৫ সালে প্রণীত খসড়া নীতি অনুযায়ী নিয়মিত পলি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে।

শেষ কথা

একদিকে ভারতের উজানে গজলডোবা ব্যারাজসহ একের পর এক প্রকল্প নিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তাায় বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। তার ওপর বাংলাদেশের উজানে পলি জমে জমে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। তাই শুকনো মৌসুমে যে অল্প পরিমাণ পানি পাওয়া যায় তা-র পরিপূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কেননা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত পরিকল্পিতভাবে নদী খননে যেতে হবে। তা না হলে উত্তরাঞ্চলের প্রাণ তিস্তার বাংলাদেশের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলার কৃষি, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান উৎসটি ধীরে ধীরে নি:শ্বেষ হয়ে যাবে।

শেয়ার করুন