০৭ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:৩৮:২১ অপরাহ্ন


মধুচন্দ্রিমার সময় কী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বিএনপি সরকার
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
মধুচন্দ্রিমার সময় কী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বিএনপি সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান


ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বে এসে তিন মাস মধুচন্দ্রিমা সময়ে একের পর এক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সরকার। হাম সংক্রমণ, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ জ্বালানি সংকট, আল নিনোর প্রভাবে মারাত্মক দাবদাহের সময়ে তীব্র বিদ্যুৎ লোডশেডিং, প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকায় পাকা ফসল ডুবে যাওয়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহনীয় জলাবদ্ধতা প্রতিটি দুর্যোগ নতুন সরকারকে বিপর্যস্ত করছে। অথচ এসব এ সরকারের সৃষ্ট নয়। বিগত সরকারের অদূরদর্শী পরিমাণ ফল ভোগ করছে বর্তমান সরকার, এটা সবাই জানে। 

গ্রীষ্ম আর বর্ষা মৌসুমের সবে সূচনা। মে থেকে অক্টোবর এ সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আরব দেশ এবং পারস্য উপসাগর এলাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো বিরাজমান। নতুন সরকারকে বর্তমান অবস্থায় জাতির সামনে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

প্রধান সমস্যা হলো ইরান যুদ্ধের বৈষয়িক প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট ভয়াবহ জ্বালানি সংকট মোকাবিলা। সরকার হয়তো উপলব্ধি করতে পারছে সংকট মোকাবেলায় সরকারের কিছু তড়িঘড়ি করে নেওয়া হঠকারী সিদ্ধান্ত সংকট ঘনীভূত করেছিল। জ্বালানি সাপ্লাই চেইন স্বাভাবিক করে জ্বালানি মূল্য সমন্বয় করার পরই পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট থেকে সৃষ্ট বিদ্যুৎ সংকট থেকে সহজে মুক্তি মিলছে না। সরকারকে অবশ্যই জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরকে স্ট্র্যাটেজিক সেক্টর বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা, দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দেশের নিজস্ব প্রাথমিক জ্বালানি কয়লা গ্যাস আহরণ উন্নয়নে কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সিংহভাগ লাইটিং এবং কুলিং লোড। তাপমাত্রা ৩৫-৪০ ডিগ্রি হলেই চাহিদা ছাড়িয়ে যায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট।


আবার ভারী বৃষ্টি হলেই নেমে আসে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। এ পরিস্থিতি থেকে সহসা মুক্তি মিলবে না। সরকারকে সর্বোচ্চ প্রণোদনা দিয়ে রুফ টপ সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিড সোলার, অফ গ্রিড মিনি, মাইক্রো সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে বার্ষিক গড়ে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত পাঁচ বছরের জন্য সকল প্রকার সোলার উপকরণের ওপর থেকে শুল্ক কর রোহিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজশর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

এরপর আসুন অতিবর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছর হাওর এলাকার ফসলহানি প্রসঙ্গে। কাহিনিটি কিন্তু পুরোনো। এ সংকট সৃষ্টির এবং ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য ২০০০ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সব সরকার ব্যর্থতা অবহেলা সমানভাবে দায়ী। অতি বর্ষণ বা পাহাড়ি ঢলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে যাবে না। কিন্তু ভাটি অঞ্চলের নদনদী, খাল-বিল নিয়মিত এবং পরিকল্পিত খনন করে পানি ধারণ এবং পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলে বৃষ্টি হলেই প্লাবন সম্ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর দুর্যোগপ্রবণ হাওর এলাকায় রাস্তাঘাট, বাঁধ নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ফসলের ধারণ এবং চাষের সময়কাল পরিবর্তনের ব্যবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে।

সাধারণ বৃষ্টিতেই ঢাকা চট্টগ্রাম নগরগুলোতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়িত্ব সকল সরকারকেই নিতে হবে। সব সরকার নগরগুলোর পাশে থাকা নদনদী ড্রেজিং, খাল-বিল পুনঃখননের পেছনে বিপুল ব্যয় করেও কেন নগরগুলোকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে পারছে না? আশা করি সরকার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নদ নদী নিয়মিত খনন আর খাল বিল দখল মুক্ত করে পুনরায় স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করাই হবে সঠিক কৌশল।

দুর্ভাগ্য নতুন সরকারের এবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেই একের পর এক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। সরকারকে ডিনায়েল সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কৌশল নিয়ে কাজ দিয়েই নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেই এগিয়ে যেতে হবে। হয়ত সরকার পরিচালনায় বিএনপি জোট কিন্তু সংকট জাতির। এমতাবস্থায় জাতীয়ভাবে সবাইকে সবার অবস্থান থেকে সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে হবে।

তবে এটা ঠিক, নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার তিন মাস না পেরোতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত, সরকার অনেকের দৃষ্টিতে দিশেহারা হওয়ার উপক্রম। এখন অনেকটাই নিশ্চিত মার্কিন ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্র আর প্রণোদনায় মেটিকুলাস ডিজাইনে শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতজানু হয়ে তাদের ডিজাইন অনুযায়ী মৌলবাদী শক্তির হাতে দেশ শাসনের ক্ষমতা ছলেবলে, কলেকৌশলে অর্পণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। অনেকটা সেই কারণেই মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরের সংবিধান, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বধারী দল, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকায় অবলীলায় হয়েছে। কিন্তু বাদ সেধেছে শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত। ওরা নিজেদের স্বার্থেই চায়নি বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসুক। 

লোকে বলে দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বে সমঝোতা হিসেবে ভারত সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি জোট। ১৭ বছর প্রবাসে থাকা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তার প্রবাস থেকে দেশে ফেরত তৃতীয়পক্ষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কে সেই তৃতীয় পক্ষ? কি ধরনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি দেশে ফিরলেন? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী না জানালেও কিছু মিডিয়ায় কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু করেছে। সংসদে সরকারি দলের ভারসাম্যহীন আলোচনা এবং বক্তব্যেও কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সরকার কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে। দূরুত্ব বেড়েছে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা জামাতের সঙ্গে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে আইন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঝুঁকি নিয়েছে। আরেকটি বিশেষ বিতর্কিত বিষয়, যা জাতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী বহুমুখী সংকট সৃষ্টি করবে, সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরিত একতরফা বাণিজ্য চুক্তি। চুক্তির অনেক শর্তই দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ। অনির্বাচিত সরকারের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর কোনো অবস্থাতেই আইন বা বিধিসম্মত ছিল না। কিন্তু জনশ্রুতি আছে বিএনপি-জামায়াত উভয় রাজনৌতিক দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকায় দেশবিরোধী চুক্তি বিষয়ে টু শব্দ করছে না। অনেকে বলছেন গণতান্ত্রিক দাবিদার সরকার বিতর্কিত চুক্তিটি সংসদে আলোচনা করে সংশোধন বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি ছিল।

সরকার কার্যক্রম শুরুর পর রোজার চ্যালেঞ্জ, টিকা কেলেঙ্কারির জন্য হাম সক্রমণ, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল যৌথ বাহিনী কর্তৃক ইরান আক্রমণের পরিণতিতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট শিল্প, বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করছে। সরকার বিষয়টি শুরুতে গুরুত্ব দেয়নি। বরং আমলাদের পরামর্শে কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।

সংসদে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা আলোচনা না করে অনেক মামুলি বিষয় নিয়ে বাহাস করে সময়, অর্থের অপচয় করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণ ভোট নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির উপক্রম হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট কিন্তু চরমে। গ্রীষ্মের বাকি সময়টা জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতেই হিমশিম খাবে সরকার। অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা নাজুক। সরকার কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে উদ্বিগ্ন। প্রভাবশালী প্রতিবেশীর প্রচ্ছন্ন চাপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির কারণে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা সীমিত এখন। আসছে বাজেট। সরকার চাইছে উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করতে। অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে কর আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও উন্নয়ন সহায়তা বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত। এমতাবস্থায় কুল রাখি না শ্যাম রাখি দোটানায় পড়া সরকার কীভাবে প্রথম বছরের সংকট মোকাবিলা করবে, সেটি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা বিশ্লেষণ।

বিএনপিতে অনেক যোগ্য অভিজ্ঞ নেতা থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত একজনকে করা হয়েছে মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর অনেক কাজই করছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ১৭ বছর প্রবাসে ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সাত বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান। বিএনপির অনেক যোগ্য নেতা কিন্তু সরকারে উপেক্ষিত। এছাড়াও দলে গত নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়েও অভ্যন্তরে ঝামেলা রয়েছে। সার্বিক অবস্থার বিবেচনায় পরিস্থিতি সংকট পথে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

শেয়ার করুন