২১ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:৪৭:৫৭ পূর্বাহ্ন


সান ডিয়েগোর মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলায় নিহত ৫
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৫-২০২৬
সান ডিয়েগোর মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলায় নিহত ৫ ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো মসজিদ


যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরে ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। পরে দুই কিশোর হামলাকারী ১৭ বছর বয়সী কেইন ক্লার্ক এবং ১৮ বছর বয়সী ক্যালেব ভেলাসকেজকেও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘৃণাজনিত অপরাধ বা হেট ক্রাইম হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। গত সোমবার বিকেলে সান ডিয়েগোর বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি, ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, দুই কিশোর বন্দুকধারী মসজিদের বাইরে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন মসজিদের নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহ ও দুইজন মুসল্লীø। সান ডিয়েগো পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি ওই নিরাপত্তাকর্মী বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার সাহসিকতার কারণে হতাহতের সংখ্যা কম হয়েছে। না হয় আরো অনেক বেশি হতাহত হতো। এ কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

পুলিশ জানায়, হামলার পর দুই বন্দুকধারী একটি গাড়িতে পালিয়ে যায়। কয়েক ব্লক দূরে তারা আরেকজন ল্যান্ডস্কেপ কর্মীর দিকে গুলি করে, যদিও তিনি অক্ষত থাকেন। পরে শহরের হ্যাটন স্ট্রিট এলাকায় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির ভেতর দুই হামলাকারীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, তারা আত্মহত্যা করেছে। পুলিশের তথ্যমতে, হামলাকারীদের বয়স ১৭ এবং ১৯ বছর। তাদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ স্পষ্ট করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হামলাকারীদের লক্ষ্য করে কোনো গুলি চালায়নি।

ঘটনার সময় মসজিদ কমপ্লেক্সে শিশুদের ক্লাস চলছিল। ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোর অধীনে পরিচালিত আল রশিদ স্কুলে আরবি ভাষা, ইসলামিক স্টাডিজ এবং কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। স্কুলটিতে পাঁচ বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে।

হামলার সময় মসজিদে থাকা শিশুদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয় পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা। টেলিভিশন সম্প্রচারিত আকাশপথের ভিডিওতে দেখা যায়, এক ডজনেরও বেশি শিশু হাত ধরে মসজিদের পার্কিং এলাকা থেকে বের হয়ে আসছে এবং চারপাশে অসংখ্য পুলিশ গাড়ি মোতায়েন রয়েছে। স্কট ওয়াহল বলেন, সব শিশু নিরাপদ আছে। এই মুহূর্তে যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জন হারানোর খবর পাচ্ছেন, আমাদের হৃদয় তাদের সঙ্গে রয়েছে। তিনি জানান, জরুরি ফোন পাওয়ার মাত্র চার মিনিটের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। এরপর ফিফটি থেকে হান্ড্রেড জন কর্মকর্তা অভিযান ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেন।

সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক ইমাম তাহা হাসসানে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানো অত্যন্ত জঘণ্য ও নিন্দনীয় কাজ। মানুষ এখানে নামাজ পড়তে আসে, উদযাপন করতে আসে, শিখতে আসে। শুধু মুসলমান নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষও এখানে আসেন। তিনি আরো বলেন, আজ সকালে কিছু অমুসলিম মানুষ ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের কেন্দ্রে এসেছিলেন। আমরা সবসময় আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতির পক্ষে কাজ করি। এমন ঘটনা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। ইমাম তাহা হাসসানে বলেন, দেশজুড়ে এবং বিদেশ থেকেও অসংখ্য মানুষ সমবেদনা জানিয়েছেন এবং সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে আমরা সব পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং শহরের সব উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।

ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করে না, বরং স্থানীয় বৃহত্তর সমাজের সেবামূলক কর্মকান্ডেও অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তারা দরিদ্রদের সহায়তা, শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।

ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কেইর সান ডিয়েগোর নির্বাহী পরিচালক তাজহিন নিজাম এক বিবৃতিতে বলেন, কেউ যেন নামাজ পড়তে গিয়ে বা শিশুদের স্কুলে পাঠিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে না হয়। আমরা ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি এবং সবাইকে এই কমিউনিটির জন্য দোয়া করার আহ্বান জানাচ্ছি।

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এক বিবৃতিতে বলেন, জেনিফার এবং আমি আজকের ভয়াবহ হামলায় গভীরভাবে মর্মাহত। ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো এমন একটি স্থান, যেখানে পরিবার ও শিশুরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একত্রিত হয় এবং উপাসনা করে। আজ সেই শান্ত পরিবেশ গুলির শব্দে ভেঙে গেছে। তিনি আরো বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় ঘৃণার কোনো স্থান নেই। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়া হাইওয়ে প্যাট্রোল এবং গভর্নরের অফিস অব ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস স্থানীয় ও ফেডারেল সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঘটনাস্থলে কাজ করছে।সান ডিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, চার মিনিটের মধ্যে পুলিশ উপস্থিত হয়েছে। আমরা যেভাবে প্রশিক্ষণ দিই এবং যেভাবে জননিরাপত্তার জন্য বিনিয়োগ করি, কর্মকর্তারা ঠিক সেভাবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মুসলিম কমিউনিটিকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা যা যা প্রয়োজন সব করব, যাতে মুসলিম সম্প্রদায় এ শহরে নিরাপদ অনুভব করতে পারে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ঘাটতি রাখা হবে না। মেয়র আরো বলেন, ঘৃণার কোনো স্থান সান ডিয়েগো শহরে নেই।

পুলিশ জানিয়েছে, ইসলামিক সেন্টারের নিরাপত্তা ক্যামেরায় হামলার ভিডিও ধারণ হয়েছে। ভিডিওগুলো এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্তে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) সহায়তা করছে।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মসজিদের আশপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অভিভাবকদের নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানে গিয়ে সন্তানদের নিয়ে যেতে বলা হয়। এ হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ইসলামবিদ্বেষ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়েছে।

ঘটনার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া গভর্নরের কার্যালয়। তবে হোয়াইট হাউস থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

সান ডিয়েগোর মুসলিম কমিউনিটি বলছে, ভয় ও আতঙ্কের মধ্যেও তারা পিছিয়ে যাবে না। ইসলামিক সেন্টারের এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, আমরা ভেঙে পড়েছি, কিন্তু আমরা থামব না। এ কেন্দ্র শুধু নামাজের জায়গা নয়, এটি আমাদের পরিবার, আমাদের কমিউনিটি। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনাস্থলে ফুল, মোমবাতি ও শোকবার্তা নিয়ে জড়ো হতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতারাও সংহতি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, এ হামলা শুধু মুসলিম কমিউনিটির ওপর নয়, পুরো আমেরিকার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহাবস্থানের মূল্যবোধের ওপর আঘাত।

শেয়ার করুন