২৭ মে ২০২৬, বুধবার, ১১:৫৪:৫১ অপরাহ্ন


‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ স্থগিতে উদ্বেগ
গ্রিনকার্ডের জন্য নিজ দেশে ফিরে আবেদন বাধ্যতামূলক
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৭-০৫-২০২৬
গ্রিনকার্ডের জন্য নিজ দেশে ফিরে আবেদন বাধ্যতামূলক ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস


যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন দেখা লাখো অভিবাসীর জন্য বড় ধরনের ধাক্কা নিয়ে এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসন নীতি। অস্থায়ী ভিসায় অবস্থানরত বিদেশিদের জন্য গ্রিনকার্ড পাওয়ার নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী ও পর্যটকসহ নন-ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসাধারীরা আর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গ্রিনকার্ডের আবেদন করতে পারবেন না। তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। 

এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থী, দক্ষ বিদেশি কর্মী, মার্কিন নাগরিকদের স্বামী-স্ত্রী এবং দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অস্থায়ী ভিসাধারীদের ওপর, যাদের অনেকেই গ্রিনকার্ডের আবেদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। 

গত শুক্রবার ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এ ঘোষণা দেয়। সংস্থাটির মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে বলেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে অবস্থানরত কোনো বিদেশি যদি গ্রিনকার্ড পেতে চান, তবে শুধু বিশেষ বা অসাধারণ পরিস্থিতি ছাড়া তাকে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, যখন বিদেশিরা নিজ দেশ থেকে আবেদন করে, তখন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। 

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, নন-ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসার উদ্দেশ্য হলো সীমিত সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা। শিক্ষার্থী, পর্যটক বা অস্থায়ী কর্মীদের ভিসা কখনোই স্থায়ী বসবাসের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। এতোদিন যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিরা দেশের ভেতরে থেকেই গ্রিনকার্ডের আবেদন করতে পারতেন। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ বা স্ট্যাটাস সমন্বয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন বিদেশি শিক্ষার্থী যদি কোনো মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করেন অথবা কোনো দক্ষকর্মী কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পেতে চান, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াই আবেদন করতে পারতেন। 

এ প্রক্রিয়া অভিবাসীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও সুবিধাজনক ছিল। কারণ আবেদন চলাকালে তারা পরিবার, চাকরি ও জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু নতুন নীতির ফলে আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে। 

জ্যাক কাহলার বলেন, আমাদের ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ভ্রমণ বা কাজ শেষ হলে তারা নিজ দেশে ফিরে যায়। তাদের সফর গ্রিনকার্ড প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে কাজ করা উচিত নয়। অস্থায়ী ভিসা স্থায়ী বসবাসের পথ নয়। 

বর্তমানে বহু বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস পদ্ধতিতে গ্রিনকার্ডের আবেদন করেন। এ পদ্ধতিতে আবেদনকারীকে দেশ ছাড়তে হয় না। কিন্তু নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সেই সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। 

সাবেক ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা ডগ র‌্যান্ড বলেন, প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ গ্রিনকার্ডের আবেদন করেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই তাদের স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদন করেন। তার মতে, নতুন নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো অভিবাসন সীমিত করা। তিনি আরো বলেন, এ নীতির উদ্দেশ্য হলো বাদ দেওয়া বা অন্তর্ভুক্ত না করা। মনে রাখতে হবে, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে শতাধিক দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নানা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফলে কাউকে বিদেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে বাধ্য করা মানে অনেকের জন্য কার্যত গ্রিনকার্ডের পথ বন্ধ করে দেওয়া। 

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ গ্রিনকার্ড পেয়েছেন। এর মধ্যে ৮ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা অর্জন করেন। 

গত দুই দশকে প্রতি বছর গড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এই পদ্ধতিতে গ্রিনকার্ড পেয়েছেন। কেবল কোভিড-১৯ মহামারির সময় এ সংখ্যা কমেছিল। বিশেষ করে বিবাহভিত্তিক গ্রিনকার্ডের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই বিবাহের মাধ্যমে গ্রিনকার্ড পেয়েছেন, যা মোট বিবাহভিত্তিক গ্রিনকার্ডের ৭০ শতাংশেরও বেশি। 

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, নতুন নীতি কার্যকর হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি প্রভাবিত হবেন। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে লাখ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও দক্ষ বিদেশি কর্মী রয়েছেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রকৌশল খাতে কাজ করা অনেক বিদেশি কর্মী এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। অনেকেই চাকরি পাওয়ার পর গ্রিনকার্ডের আবেদন করেন এবং আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রেই থাকেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হতে পারে, যা চাকরি ও পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। এতে শুধু পরিবার নয়, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতগুলো বিদেশি দক্ষ কর্মীর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। 

ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপ দেখাচ্ছে যে, তারা শুধু অবৈধ নয়, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকেও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। গত কয়েক মাসে প্রশাসন নাগরিকত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির নাগরিকত্ব পুনর্বিবেচনা এবং গ্রিনকার্ডধারীদের নথি পুনঃপর্যালোচনার উদ্যোগও নিয়েছে। 

নতুন এ সিদ্ধান্তকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এটি কার্যকর হলে লাখো মানুষের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গভীর প্রভাব পড়বে। 

শেয়ার করুন