২২ জুলাই ২০১২, সোমবার, ০৭:৩৮:০৪ অপরাহ্ন


নিউইয়র্কসহ উত্তর আমেরিকায় ঈদ উদযাপন
ফিলিস্তিনিসহ সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তি কামনা
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৬-২০২৪
ফিলিস্তিনিসহ সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তি কামনা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে ঈদ জামাত


যুদ্ধে বিধ্বস্ত এবং মানবতাহীনভাবে বসবাসরত ফিলিস্তিনবাসীসহ সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনায় নিউইয়র্কসহ উত্তর আমেরিকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। আবহাওয়া ভলো থাকায় অধিকাংশ মসজিদের পক্ষ থেকে খোলা আকাশের নিচে ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার কোনো মসজিদের পক্ষ থেকে মসজিদের ভেতরেই একাধিক ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবহাওয়া ভালো এবং স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় এবারের ঈদ জামাতের যেন বাংলাদেশিসহ সারা মুসলিম সম্প্রদায়ের ঢল নামে ঈদ জামাতগুলোতে। প্রতিটি ঈদ জামাতেই নতুন প্রজন্ম এবং মহিলাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ফিলিস্তিনবাসীর ঈদ উদযাপন নিয়ে। কারণে ইসাইয়েলের আগ্রাসনের কারণে ফিলিস্তিনবাসী ঈদ উদযাপন ছিল অনেকটাই কঠিন। কারণ তাদের মসজিদ এবং স্থাপনাগুলো যুদ্ধের কারণে গুঁড়িয়ে গেছে। তাই তাদের ভাঙা এবং বিধস্ত এলাকায় নামাজ পড়েতে দেখা গেছে। আবার কোরবানিতে দূরের কথা। এমনিতেই তারা চর খাদ্য এবং পানীয় সংকটে রয়েছে। যে কারণে প্রতিটি ঈদ জামাতেই ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়।

ত্যাগের মহিমা নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত মুসলমানরা এদিন পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বত্রই ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঈদ জামায়াত। অধিকাংশ ঈদ জামায়াত সকাল ৭টা থেকে সকাল ১০টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মসজিদ ও ঈদগাহ প্রাঙ্গণ।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের পরিচালনায় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার, জ্যাকসন হাইটস ইসলামিক সেন্টার অ্যান্ড জামে মসজিদ, মুনা ইসলামি সেন্টার, জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাবাজার জামে মসজিদ, নর্থ ব্রঙ্কস ইসলামিক সেন্টার, জ্যাকসন হাইটস মোহাম্মদী সেন্টার, পার্কচেস্টার জামে মসজিদ, ওজনপার্কের মসজিদ আল আমান, এস্টোরিয়ার আল আমিন মসজিদ, ব্রুকলিনের বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টার, ম্যানহাটনের আসসাফা ইসলামিক সেন্টার, বায়তুল জান্নাহ মসজিদ, ফুলতলী ইসলামিক সেন্টার অ্যান্ড মসজিদ, সানিসাইড মসজিদ, মসজিদ আবু হুরায়রা, জ্যামাইকার দারুস সুন্নাহ জামে মসজিদ, আল ফোরকান জামে মসজিদ, আমেরিকান মুসলিম সেন্টার, শাহজালাল মসজিদ, গাউছিয়া মসজিদ, পার্কচেস্টার ইসলামিক সেন্টার, ব্রঙ্কস মুসলিম সেন্টার, ব্রুকলিনের বেলাল মসজিদ, এস্টোরিয়া ইসলামিক সেন্টার, আর রহমান মসজিদসহ অন্য মসজিদের ব্যবস্থাপনায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ মসজিদের উদ্যোগে গত ১৬ জুন রোববার ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। যদিও গুটিকতেক মসজিদের উদ্যোগে ঈদ পালন করা হয় ১৭ জুন। ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিরা কোরবানি দিতে চলে যান বিভিন্ন ফার্মে। আবার যারা বাংলাদেশি গ্রোসারিতে কোরবানি দিয়েছেন, তারা মাংস আনতে চলে যান সেসব গ্রোসারিতে। মাংস এনে তারা আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিতরণ করেন। অনেকেই আবার বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত খেতে চলে যান।

নিউইয়র্কে জ্যামাইকায় বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগে টমাস হাইস্কুল মাঠে সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ ঈদ জামাতে হাজার হাজার মানুষ জামাতে অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘ ধরেই এখানে ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে আসেন এখানে ঈদের জামাতে অংশ নেওয়ার জন্য। পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। ঈদ জামাতের পূর্বে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আফতাব মান্নানের পরিচালনায় সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার ব্যান্ড ল্যান্ডার, অ্যাসেম্বলিম্যান জামরান মামদানী, মসজিদের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. নাজমুল খান, মসজিদ কমিটির সভাপতি ডা. মাহমুদুর রহমান। এই ঈদ জামাতে নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল নাজমুল হুদা এবং সাংবাদিক শাবান মাহমুদসহ কমিউনিটির সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

ঈদ জামাতে ইমামতি করেন জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের ইমাম মাওলানা মীর্জা আবু জাফর বেগ এবং খুতবা দেন মসজিদের আরেক ইমাম মাওলানা শামসে আলী। বিশেষ দোয়ায় ফিলিস্তিনবাসীসহ সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।

দারুস সালাম মসজিদ

জ্যামাইকায় বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত জ্যামাইকা দারুস সালাম মসজিদের উদ্যোগে গত ১৬ জুলাই মসজিদের ভেতরে ঈদের চারটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামাতে ইমামতি করেন মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা আবদুল মুকিত। দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করেন হাফেজ আশরাফ আহমেদ, তৃতীয় জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা মোহাম্মদ আলী এবং চতুর্থ জামাতে ইমামতি করেন হাফেজ মাওলানা মুইনুল ইসলাম। প্রথম জামাত ছাড়া শেষের জামাতগুলোতে মহিলাদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি জামাত শেষে সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।

ওজনপার্ক

ওজনপার্কের ফুলতলী জামে মসজিদ: স্থানীয় পিএস ৬৪ স্কুল পার্কে সকাল ৮টায় একটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে ইমামতি করেন মসজিদের ইমাম খতিব মোহাম্মদ আলীম।

আল- ফুরকান জামে মসজিদ: ৭৭ স্ট্রিট ও গ্লীন মোরের ওপর অবস্থিত মসজিদে সকাল সাড়ে ৮টায় একটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা সায়ফুল ইসলাম। 

আল আমান মসজিদ: ফরবেল স্ট্রিটে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী আল আমান মসজিদে ১৬ এবং ১৭ জুন দুদিন ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিন রবিবার ঈদের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে। ইমামতি করেন মুফতি মাওলানা হাফিজ ইউসা ইসলাম। দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে ৮টায়। ইমামতি করেন হাফিজ কামাল মোহাম্মদ। 

পরদিন ১৭ জুন সোমবার আরেকটি জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে। ইমামতি করেন মুফতি শোয়েব।

উল্লেখ্য, আল আমান মসজিদে রবিবার ও সোমবার ঈদের জামাত নিয়ে গত দু-তিন দিন মুসল্লি ও কমিটির মধ্যেই বাকবিতণ্ডা ছিল তুঙ্গে। বেশির ভাগ সাধারণ মুসল্লি ১৬ জুন রবিবার ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে ছিল। মসজিদ কমিটি ও কিছু মুসল্লি কমিটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে ছিলেন একমত। সাধারণ মুসল্লিরা সৌদি আরব অর্থাৎ গ্লোবাল মুন সাইটিংয়ের ফলোয়ার। কমিটি ও তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যারা একমত তারা স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর। আবার কেউ কেউ গ্লোবাল বা স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাদের মতে, সৌদি আরবে ঈদ। অতএব এখানেও ঈদ। ঈদের জামাত নিয়ে মসজিদ আল আমানে বিতর্ক নতুন নয়। প্রায় ৩০ বছর পূর্বেও কমিটি থাকা অবস্থায় দুই দিনে মসজিদে ঈদের জামাত হয়েছিল। এবারে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ মুসল্লিরা কমিটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ১৬ জুন রবিবার ঈদ জামাত করে। ঈদের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী আল আমান মসজিদের স্বার্থে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।

ব্রঙ্কস

নিউইয়র্কে নর্থ ব্রঙ্কস ইসলামিক সেন্টার অ্যান্ড জামে মসজিদের উদ্যোগে ১৬ জুন রোববার মসজিদ নিকটবর্তী ওভাল পার্কের খোলা মাঠে ঈদুল আজহার বিশাল ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত এ ঈদ জামাতে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন। নামাজে ইমামতি এবং ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন মসজিদের ভারপ্রাপ্ত খতিব হাফিজ সাজ্জাদুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন। নামাজ শেষে মিলাদ ও মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র মানবতার কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন হাফিজ সাজ্জাদুর রহমান।

ঈদ জামাতে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন মসজিদ কমিটির সভাপতি সৈয়দ জামিন আলী, সহ-সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাহ, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাহবুব হুসেইন, সহ-কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ রাহুল ইসলাম, কার্যকরি সদস্য সৈয়দ ইসতিয়াক আলী, মো. আব্দুল হক হেলাল, মো. মহি উদ্দিন, হারুনুর রশিদসহ কমিটির কর্মকর্তারা।

নিউইয়র্ক ঈদগাহ

নিউইয়র্কের মিনি বাংলাদেশ জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় ঈদুল আজহার ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে ডাইভারসিটি প্লাজায় এসে ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য এলাকার মুল্লিদের প্রতি ধন্যবাদ জানান নিউইয়র্ক ঈদগাহর পরিচালক ইমাম কাজী কায়্যূম। নিউইয়র্ক ঈদগাহর কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালে। কর্মব্যস্ত নিউইয়র্ক নগরীর মুসলমানদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই প্রতিটি ঈদে এখানে ৫টি জামাতের আয়োজন করা হয়। মুসল্লিদের কথা বিবেচনা করেই প্রথম জামাতটি অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৬টায়। তারপর ৭, ৮, ৯ ও ১০টায় নিউইয়র্ক ঈদগাহর আরো ৪টি জামাতসহ মোট ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি মুসল্লিদের অনবরত আগমন ঠেকাতে ৫টি জামাতের পরও আরেকটি অতিরিক্ত জামাতের ব্যবস্থা করা হয় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে।

শেয়ার করুন