প্রস্তাবিত ইপিক আবাসন প্রকল্প
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেটে মুসলিম সম্প্রদায়কেন্দ্রিক একটি বৃহৎ আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে চলমান ফেয়ার হাউজিং বিতর্কে ডেভেলপারদের পক্ষে গত ২৮ এপ্রিল টেক্সাস স্টেটের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে ট্র্যাভিস কাউন্টির ২০১তম জেলা আদালত। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, স্টেটের কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রক হয়রানির মাধ্যমে কলিন কাউন্টির একটি মুসলিম উন্নয়ন প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন। এর আগে কমিউনিটি ক্যাপিটাল পার্টনার্স (সিসিপি) এবং ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার (ইপিক) এর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়। কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, দ্য মেডো নামে পরিচিত প্রকল্পটি আইনের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে যা আদালত প্রত্যাখ্যান করেছে। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, স্টেটের সংস্থাগুলো ইচ্ছামতো চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে না এবং তাদের সৎ বিশ্বাসে কাজ করতে হবে। রায়ে আরো উল্লেখ করা হয়, জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, লিঙ্গ, অক্ষমতা বা পারিবারিক অবস্থার ভিত্তিতে কোনো প্রকল্পকে বৈষম্যমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এপিক সিটি নামে পরিচিত, বর্তমানে দ্য মেডো হিসেবে পুনঃব্র্যান্ড করা এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশন এবং ডেভেলপার কমিউনিটি ক্যাপিটাল পার্টনার্সের মধ্যে দীর্ঘ আইনি বিরোধ চলছিল। মামলাটি শুরু হয় যখন ডেভেলপাররা অভিযোগ করেন যে, স্টেটের সংস্থাটি তাদের জমা দেওয়া নতুন ফেয়ার হাউজিং নীতিমালা বিবেচনা বা অনুমোদনে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্টেট সংস্থা নীতিমালা অনুমোদন করবে এবং প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা দেবে না।
মামলার মূল প্রশ্ন ছিল যে টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশন ফেডারেল ফেয়ার হাউজিং অ্যাক্ট অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে কি না, নাকি তারা ডেভেলপারদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে এবং সমঝোতা চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। ডেভেলপারদের দাবি ছিল, স্টেট সংস্থা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে তাদের প্রকল্পের নীতিমালা অনুমোদন আটকে রেখেছে, যা মুসলিম-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণের একটি বৃহত্তর প্যাটার্নের অংশ। অন্যদিকে টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশন দাবি করে, প্রস্তাবিত নীতিমালা ফেয়ার হাউজিং আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং প্রকল্পটি এখনো ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্টের (এইচইউডি) যৌথ তদন্তের অধীনে রয়েছে।
ট্র্যাভিস কাউন্টির ২০১তম ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট গত মঙ্গলবার এক অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করে টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশনকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়া সমঝোতা চুক্তি মেনে চলার নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, স্টেট সংস্থাটি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ডেভেলপারদের জমা দেওয়া ফেয়ার হাউজিং নীতিমালা কার্যকরভাবে বিবেচনা ও অগ্রসর করতে বাধ্য। এরপর বুধবার আদালত রাজ্য সরকারের মামলা খারিজের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করে, ফলে কমিউনিটি ক্যাপিটাল পার্টনার্সের মামলা চলমান রাখার অনুমতি পায়।
এই রায়কে ডেভেলপারদের জন্য বড় আইনি জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি প্রকল্পের ওপর থাকা প্রশাসনিক স্থগিতাদেশ কিছুটা শিথিল করেছে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম পুনরায় শুরুর সুযোগ তৈরি করেছে। কমিউনিটি ক্যাপিটাল পার্টনার্স জানায়, তারা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ফেয়ার হাউজিং নীতিমালা বাস্তবায়ন শুরু করবে এবং প্রকল্প সংক্রান্ত জনসংযোগ কার্যক্রম পুনরায় চালু করবে, যা আগে স্থগিত ছিল। প্রকল্পটির প্রেসিডেন্ট ইমরান চৌধুরী বলেন, এই রায় তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে যে তারা শুরু থেকেই টেক্সাস আইন মেনে চলেছে এবং কোনো ভুল করেনি। ডেভেলপারদের আইনজীবী এরিক হাডসন বলেন, আদালত স্পষ্ট করেছে যে আইন রাজ্য সংস্থার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
অন্যদিকে টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশন আদালতের রায়কে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করে জানিয়েছে, এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপেক্ষিত হয়েছে যেখানে ডেভেলপারদের ফেয়ার হাউজিং আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থাটি আরো জানায়, প্রকল্পটি এখনো ফেডারেল তদন্তাধীন এবং তারা দ্রুত আপিল করবে। পরদিন গত ২৯ এপ্রিল টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করলে তা আদালত খারিজ হয়।
প্রায় ৪০২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠার পরিকল্পনা করা দ্য মেডো প্রকল্পে ১,০০০-এর বেশি আবাসন, কেজি থেকে ১২ শ্রেণি মুসলিম ধর্মভিত্তিক স্কুল, মসজিদ, প্রবীণদের আবাসন, ক্লিনিক, কমিউনিটি কলেজ, বাণিজ্যিক এলাকা ও ক্রীড়া সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি ডালাসের উত্তর-পূর্বে জোসেফিন শহরের কাছে অবস্থিত। ২০২৫ সালের মার্চে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ঘোষণা দেন যে স্টেটের একাধিক সংস্থা প্রকল্পটির বিরুদ্ধে ফেয়ার হাউজিং লঙ্ঘনের তদন্ত শুরু করেছে। এরপর থেকেই এটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের সদস্যরা এই উন্নয়ন কোম্পানি গঠন করেন, যা উত্তর টেক্সাসের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসেবে পরিচিত।
এই মামলার রায় ডেভেলপারদের জন্য স্বস্তি আনলেও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, কারণ স্টেট সরকারের আপিল, চলমান ফেডারেল তদন্ত এবং অবকাঠামো সংক্রান্ত পৃথক আইনি বাধা এখনো বিদ্যমান। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি আবাসন প্রকল্পের বিরোধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয়, ফেয়ার হাউজিং আইন এবং রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হয়ে উঠতে পারে।