২২ জুলাই ২০১২, সোমবার, ০৭:১৫:১৪ অপরাহ্ন


বিএনপির আস্থায় মির্জা ফখরুল না অন্য কেউ
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৭-২০২৪
বিএনপির আস্থায় মির্জা ফখরুল না অন্য কেউ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ড. মঈন খান


বিএনপির মহাসচিবে পরিবর্তন, এটা বেশ কিছু দিনের আলোচনা। কোথা থেকে এ আলোচনা উঠেছিল তা ঠাহর করা না গেলেও এ আগুনে জ্বলছে দল ও স্বয়ং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। এমন কিছু কথা থাকে যেগুলো বলা যায় না, হজম করতে হয় প্রতিনিয়ত। বর্তমান মহাসচিব তার উদাহরণ। মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন এ পদে থেকেও কেন তার বিরুদ্ধে উঠছে অভিযোগ, কেন তাকে পরিবর্তন করা হচ্ছে বলে যে গুজব বিএনপিসহ দেশের সর্বত্র সেটা আজও অজানা! বিএনপি তাদের রুটিনওয়ার্কগুলো করে গেলেও তৃণমূলে একটা চরম আস্থাহীনতা রয়েই যাচ্ছে। দলে আস্থা ফেরাতে কিছু সময় একটা বড় পরিবর্তনে সব অশান্তি চাপা পড়ে নতুন উদ্যমে শুরু হয় সব। মির্জা ফখরুল কী তেমন কিছুর বলি? মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের সবার কাছেই রয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। সেটা দলের ভেতরেই শুধু নয় পরম শত্রু মহলেও। তাছাড়া একজন শিক্ষক মির্জা ফখরুল। সে সূত্র ধরে তার কথাবার্তা, চলন-বলনে কোথাও কেউ ত্রুটি ধরার সুযোগ নেই। বিএনপির মতো একটি দলের মহাসচিবের অনেক পাওয়ার। কিন্তু মির্জা ফখরুল সেটা প্রদর্শনে ব্যর্থ, সেটা সবারই জানা! শুধু মির্জা ফখরুলই নন, ওই পদে যিনিই আসবেন, তাকে অন্তত চেয়ারপারসন বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা মানতেই হবে। 

তবুও বিগত আন্দোলনে বিএনপির যে ব্যর্থতা প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে সেটার দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। কেননা কখনই আন্দোলন ও সফল আন্দোলন ছাড়া কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় না। ভুলে গেলে চলবে না, এমনকি বিএনপিকে যখন ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল তখনও ব্যাপক আন্দোলনের মাধ্যমেই সেটা সম্ভব হয়।

ফলে আন্দোলনের পথ মাড়িয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন করতে হবে এটাই এখন বাংলাদেশের রীতিতে পরিণত। বিএনপি আন্দোলন করতে জানে না এটা বললে ভুল হবে। অতীতে বহু আন্দোলের নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। যার মধ্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলন অন্যতম। আওয়ামী লীগ এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েও শেষ অবধি গিয়েছিল। অথচ বিএনপি ও আওয়ামী লীগে কথা হয়েছিল এরশাদের বিরুদ্ধে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। বিএনপিকে রেখে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে যাওয়াটা তাদের একটা কৌশলগত সফলতা বললেও আজও সেটাকে বেইমানি হিসেবে অনেকে মনে করেন। কিন্তু সেটা ভিন্নকথা। আজ যে দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সেটা হয়তো সে সময় নির্বাচনের যাওয়ার অর্জনের কোনো যোগসূত্র এর সঙ্গে জড়িয়ে! 

দীর্ঘ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি সেভাবে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ পায়নি, বা আওয়ামী লীগও সে সুযোগ দেয়নি। এসব কারণেই দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ও চূড়ান্ত আন্দোলনের শেষলগ্নে এসে অজ্ঞাত চুপ হয়ে যাওয়া তৃণমূলে নানা সন্দেহের দানা মিলছে। এ নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরেও নানা কথা। 

কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বসে থাকলে তো আর চলবে না। বিএনপি আবারও গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে চায়। সে চেষ্টা এখন হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির ব্যর্থতার পর খোদ সরকারি দল থেকে যে উপহাস করা হচ্ছে বিএনপিকে নিয়ে সেখানেই প্রথম উচ্চারিত হয় বিএনপি মহাসচিবের পদত্যাগ করা উচিত। সে থেকেই ক্রমশ সন্দেহের ডালমালা মেলতে থাকে। তৃণমূলেও চিন্তাভাবনা চলছে। বড় কোনো আন্দোলনের রূপ না দেওয়ার পেছনে কী মহাসচিবের কোনো হাত আছে? দলের অভ্যন্তরে ওই সন্দেহের ডালপালা এখন দিনে দিনে অনেক বেড়েছে। এমনকি অনেকেই চায়ের কাপে ফখরুলের স্থানে অন্য কে আসতে পারে সেটা নিয়েও অ্যাডভান্স আলোচনা করছেন। 

গত ২৮ অক্টোবর পল্টনে মহাসমাবেশ প- হওয়ার পর গণহারে আটক হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এরা নির্বাচনের পর এক এক করে ফিরলেও বিএনপি এখনো আন্দোলনে নামতে পারেনি। এখন শোনানো হচ্ছে ধীরে ধীরে ওই লক্ষ্যে এগোচ্ছে দল। কিন্তু এমনি মুহূর্তে বিএনপির বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে আবার সরব মহাসচিবের পদ এবং এ পদে কারাগার থেকে বের হয়ে ফখরুল নিজেও থাকতে চান না বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কারণ হিসেবে তার বয়স, অসুস্থতা ও স্ত্রীর ক্যানসার ও বিগত সময়ের আন্দোলনে সুফল না পাওয়া। যদিও এ ব্যাপারে মির্জা ফখরুলের নিজস্ব মতামতের একটা বিষয় যেমন তেমনি তিনি নিজেও চান নেতৃত্বে পরিবর্তন। কিন্তু দল যদি তাকেই প্রয়োজন মনে করে, তখন তো কিছু করার থাকবে না। এমতাবস্থায় একটিই প্রশ্ন তাহলে মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল থাকছেন না অন্য কেউ। এ অন্য কেউ কে কে, দলের অভ্যন্তরে তো বটেই তারও একটা আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ জোরালোভাবে চলছে। 

মির্জা ফখরুল পরবর্তী মহাসচিব পদে আলোচনায় যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন- আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবীর রিজভী, সালাহউদ্দিন টুকু। তবে এদের মধ্যে কেউ বা এর বাইরেও যদি কাউকে এ পদে বাছাই করা হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। তার দায়িত্ব বর্তমানে পালন করছেন তারেক রহমান। মূলত এসব পরিবর্তন ও আন্দোলনের গতি প্রকৃতিসহ যাবতীয় সবকিছুতেই রয়েছে তার সক্রিয় বিবেচনা। যদিও তিনি কোনো সিদ্ধান্তই চেয়ারপারসনের সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে নেন না, তবু যেহেতু বয়সে তিনি অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের তুলনায় তরুণ। তাইতো তারেক রহমান এমন একজনকেই চাইবেন যিনি দলের প্রতি অবিচল। যার আন্তর্জাতিক যোগাযোগটা ভালো। দলের তৃণমূল থেকে সর্বত্র যার গ্রহণযোগ্যতাও হবে বেশি। এসব বিবেচনায় কাকে তিনি এগিয়ে রেখেছেন, এবং যিনি মির্জা ফখরুলের যোগ্য উত্তরসূরি হবেন সেটা তিনিই ভালো জানেন। 

অবশ্য বিএনপিদলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েই সেটা চূড়ান্ত করে। তবুও ওই চাওয়ার একটা গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। কেননা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটিতে নিবেদিত ও নিজেকে গুটিয়ে রাখা এমন নেতাদের সংখ্যা ইতিমধ্যে নোট করা হয়ে গেছে নীতিনির্ধারকদের। দলের সুসময় নয়, দুঃসময় যারা নিবেদিত তাদেরই আসল নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এটাই স্বাভাবিক। সেদিক থেকে উপরোক্ত নামগুলোর সংশ্লিষ্টতা বেশ রয়েছে। বয়সে তরুণ হলেও আরো কিছু নাম ওইখানে যোগ হলে হতেও পারে। তবে এটা ঠিক বিএনপি একটি কঠিন সময় পার করছে। শুধু কঠিন বললে ভুল হবে, বিএনপি সত্যিকার অর্থেই গর্তে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায়। 

বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের হিসেব কষলে বিএনপির বর্তমান সময়ে খানিকটা পিছিয়ে। বলার আর অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুকাল থেকেই ভারতের হস্তক্ষেপ রয়েছে। যদিও সেটা অগোচরের কথা, তবু ওই ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে যা আরো পরিষ্কার হয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। ফলে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন ভারতকে খুশি করে বা ভালো সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েই। 

আওয়ামী লীগ সব বাদ দিয়ে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশকেও প্রকাশ্যে বিভিন্ন তীর্যক মন্তব্য করেও যথারীতি টিকে থাকা ও ক্ষমতা ধরে রাখার পেছনে ভারত। ফলে বিএনপিকেও এ থেকে এখন ব্যাপক শিক্ষা নিতে হচ্ছে। যার জ্বলন্ত প্রমাণ রুহুল কবীর রিজভীর ভারতীয় পণ্য বর্জনে নিজের গায়ের চাদর প্রকাশ্যে পোড়ানো। কিন্তু ওই পর্যন্তই সব। এরপর বিএনপি কিছুটা দেরি করে সিদ্ধান্ত নিলেও ভারতের বিপক্ষে নয় বলে জানান দিয়েছে। বিএনপি এড়িয়ে গেছে ভারত বিরোধিতা থেকে এমনকি ভারতীয় পণ্য বয়কট আন্দোলন থেকেও। 

সর্বশেষ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে চুক্তি ও সমঝোতাগুলো হয়েছে সেগুলোর কঠোর সমালোচনা করলেও সেটা ভারতের সমালোচনা করেনি বিএনপি। করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে এসেছে। বিভিন্ন চুক্তি করলেও বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে আদায়ে ব্যর্থ এমন কথাগুলো বলছেন। সংগত কারণেই বিএনপি তার মহাসচিব পদে এমন একজনকে নিয়ে আসবে যিনি এসব ব্যাপারে খুবই দক্ষ ও কৌশলী হবেন। কারণ ক্ষমতায় আসতে ভারতের সুনজর প্রয়োজন এটা বিএনপি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। 

সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপিকে যদি মহাসচিব পদে পরিবর্তন আনতে হয়। আর যদি নানা টেকনিকের দিকে খেয়াল দিতেই হয় সেক্ষেত্রে এতোকিছুর মধ্যে না গিয়ে ফখরুলেই আস্থা রাখতে পারে দলটি। কারণ এর বড় একটা রেফারেন্স খোদ আওয়ামী লীগ। প্রচণ্ড অসুস্থ ও ব্যাপক সমালোচনার পরও শেখ হাসিনা ও তার দল যেখানে ওবায়দুল কাদেরেই আস্থা রেখেছিলেন গত এজিএমে। 

বিএনপির এজিএম হচ্ছে না দীর্ঘদিন। হওয়ার তেমন সম্ভাবনাও নেই আপাতত। ফলে মহাসচিব পরিবর্তনের ইস্যুটা আলোচনায় উঠলেও সাংগঠনিকভাবে এর কোনো ভিত্তি নেই। দল যদি এ বিষয়টাতে নজর দেওয়ার প্রয়োজন না করে, বা ফখরুল যদি নিজ থেকে দায়িত্বে ইস্তফা না দেন, তাহলে এর পরিবর্তন হওয়া না হওয়ার আলোচনা হালে পানি পাবে না। এ পর্যন্ত এমন কিছুই ঘটেনি যা দ্বারা এমন পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও সরকার দলের পক্ষ থেকে একটা সমালোচনা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। হতে পারে সেটা প্রতিপক্ষকে দমাতে কোনো কৌশল! কারণ বর্তমান যুগে মির্জা ফখরুলের মতো ভদ্র ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বড্ড প্রয়োজন। যেখানে তুলনায় অন্যরা পিছিয়ে। বিএনপি নিজের প্রয়োজন ব্যতিরেকে এগুলোতে অতীতেও কান দেয়নি হয়তো ভবিষ্যতেও দেবে বলে মনে হয় না।

শেয়ার করুন