২৫ মে ২০১২, শনিবার, ০৮:১৬:০৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে- ওবায়দুল কাদের মানুষের ক্ষতি যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযান ও নদী দখল-দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ুন - পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ দেয়া হবে- ডোজারিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সমাবেশ হেলিকপ্টার দূর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট সহ অন্যান্যদের মৃত্যুতে বিএনপির শোক ভারতে ঘুরতে যেয়ে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য খুন তামাকমুক্ত লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী তামাককরের বিকল্প নেই


কথার কথকতা
মাইন উদ্দিন আহমেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৭-১০-২০২২
কথার কথকতা


একটা ছেলে একটা মেয়ের কথায় মুগ্ধ হয় এবং একটা মেয়ে একটা ছেলের কথায় মুগ্ধ হয়। আসলে বলতে চাচ্ছি যে, এরা পরস্পরের কথায় মুগ্ধ হতে পারে, মুগ্ধ হবার সম্ভাবনা প্রচুর। মুগ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গটি এদের ক্ষেত্রেই বেশি হওয়া বা ঘটার সম্ভাবনা বেশি, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং আশা করি এই কথার ক্ষেত্রে কেউ কোনো ভিন্নমত প্রকাশ করার সম্ভাবনাও কম। তবে এই মেয়ে এবং ছেলে যখন নারী ও পুরুষে পরিণত হয়, তখন মুগ্ধ অথবা বিমুগ্ধ হবার ঘনত্ব কমে আসে অর্থাৎ সংখ্যায় মানে বারের হিসাবে কমে আসে, বয়স কম থাকতে যেটা দশবার ঘটবে, বয়স বেড়ে গেলে তা তিনবার বা দু’বার ঘটবে অর্থাৎ ঘন ঘন মুগ্ধ হবার বিষয়টি অনেক কমে আসে। আর মজার ব্যাপার হলো, ছেলে-মেয়ে থেকে বড় হয়ে পুরুষ-নারী হয়ে যাওয়া এই দু’জনই যদি পরস্পরকে বিয়ে করে ফেলেন, তখন মুগ্ধ হবার বিষয়টি যেন খুব কঠিনই হয়ে পড়ে। বিয়ের পর তিন মাস, ছয় মাস বা এক বছর সময় পরস্পর পরস্পরের কথা ও কাজে মুগ্ধ হবার কিছুটা সম্ভাবনা থাকে। একসময় মুগ্ধতার অভাব দেখা দেয়। মনে হয় যেন জীবনের এ পর্ব মুগ্ধতার নয়, এটা সন্দেহ এবং অসন্তোষ পর্ব। এটা মাত্রার হেরফের হলেও প্রায় সর্বক্ষেত্রেই প্রবণতা একই রকম। ব্যতিক্রমী দু’একটা দম্পতি থাকতেও পারে। হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক প্রশ্ন তুলতে পারেন: এক্ষেত্রে এই কলামিস্ট সাহেবের কি অবস্থা? উত্তর কি হতে পারে অনুমান করে নিন। কারণ আমি এর উত্তর প্রদানে অনীহা প্রকাশ করবো। তবে বলি শুনুন, আজ সকালে একটা অন্যরকম ঘটনা ঘটেছিলো। আমরা দু’জন কি যেন একটা পারিবারিক বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম। কোনো এক প্রসঙ্গে আমার জীবনসঙ্গিনী কিছু একটা মন্তব্য করেছিলেন, যাতে আমি এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ওনার এই কথার ওপরই লিখবো এই সপ্তাহের কলাম। কিন্তু রাতে যখন লিখতে বসলাম, তখন কি হলো জানেন? আমি সকালকার কথার বিষয়বস্তুই মনে করতে পারলাম না। অনেক্ষণ চেষ্টা করলাম মনে করার জন্য, হলো না। মনে এলোই না! আমি কথাটা ওনাকে জিজ্ঞেস করতে চাইনি। কারণ এটা হবে খুবই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। ভাবতে ভাবতে মাথার চুলও ছিঁড়তে পারলাম না। কারণ মাথায় চুল তো নেই। অবশেষে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, সকালে আমরা কি নিয়ে কথা বলছিলাম? মনে করতেই পারছি না! তিনি গুরুগম্ভীর কণ্ঠে কিশোর-ছাত্রের মধ্যবয়সী শিক্ষিকার মতো করে বললেন: এগুলো সাথে সাথে লিখে রাখতে হয়। এ কথা বলে তিনি ব্যস্ত মানুষের মতো দ্রæত সরে পড়লেন, আমি বেক্কলের মতো স্থির হয়ে গেলাম। লেখার স্পৃহা হাওয়া হয়ে গেলো। কি করা যায় ভাবতে থাকলাম। অনেক সময় ধরে বাতাসের দেয়ালে মাথা পেটানোর পর বাতাস ফিসফিস করে একটা বুদ্ধি দিলো। দেখা যাক, ওই পরামর্শ কতোটা ফলপ্রসূ হয়।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়, আমি বিগত কোনো এক লেখায় কিছু অন্যরকম ঘটনার কথা লিখেছিলাম যেগুলো আমাকে কেন্দ্র করে ঘটেছিলো। ওই রকম নতুন করে ঘটে যাওয়া আরো কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করবো আজ।

জ্যাকসন হাইট গেলে আমি সাধারণত নবান্ন রেস্টুরেন্টের আশপাশ এলাকা থেকে ডাইভারসিটি প্লাজা পর্যন্ত এই স্থানটিতেই বিচরণ করি। সম্প্রতি লক্ষ করলাম যে, বার্চউড হাউজিংয়ের সামনের অন্ধকার অংশে বেশ রাত হলে একজন লম্বা গড়নের মানুষ এসে গাছতলাটিতে দাঁড়ান এবং ফিসফিস করে ভৌতিক কণ্ঠে সালাম দেন। স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে দাঁড়ানো থাক দূরের কথা, উত্তর দেবারও সাহস পাই না। এ রকম অভিজ্ঞতা আমার বেশ কয়েকদিন ঘটেছে। রহস্যজনক এই ঘটনাটি কি শুধু আমার সাথেই ঘটছে? নিউইয়র্কে রহস্যজনক ঘটনা অনেক বেড়েছে বলে আগের কোনো একটি লেখাতেও উল্লেখ করেছিলাম। এগুলো ভৌতিক কাণ্ড না কি কোনো সংস্থা বা সংস্থাসমূহের কর্মকাণ্ড, এ রকম প্রশ্নও আমি তুলেছিলাম।

এবার বর্ণনা করবো গতকাল সাবওয়েতে ট্রেনে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা। জ্যাকসন হাইট থেকে ট্রেনে উঠলাম বাসায় যাবো বলে। পথে কোনো এক স্টেশনে আমার বিপরীত দিকের সিটে বসলো এক তরুণী, বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে হতে পারে। গঠনে মনে হলো, এশিয়ার একটি বড় দেশের কোনো এক অঞ্চলের মানুষ। ভ্রমণরত মেয়েদেরকে নিউইয়র্কে লক্ষ করার তেমন ব্যতিক্রমী ঘটনা কম। কারণ নারী ও পুরুষ সবাই জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত। কিন্তু এই মেয়েটিকে লক্ষ করলাম অনেকগুলো কারণে। সে একটা বই খুলে পড়বার ভাণ করছিলো যেটির টাইটেল হলো সেক্স। বইটি ইংরেজি এবং এই শব্দের আগে আরেকটি শব্দ ছিলো যেটি দূরত্বের কারণে পড়া যাচ্ছিলো না। তাকে লক্ষ করার আরেকটা কারণ হলো, মেয়েটি বইটা খুলে পড়ার ভঙ্গিতে খুলে হাতে রেখেছে, কিন্তু সে পড়ছে না, বই খোলা রেখে মোবাইল ফোনে রহস্যজনক আচরণ করছিলো। একসময় দেখা গেলো, সে তার দৃষ্টিতে আলো সঞ্চার করছে এবং আমার মতো একটা ‘বুড়ো’ মানুষের চোখে আলোক সম্পাতের চেষ্টা করছে। আমি সাবধান হওয়ার চেষ্টা করলাম। দৃষ্টি অবনত করে ভাবতে শুরু করলাম, আমাকে কেন টার্গেট করলো মেয়েটি? যদি আমাকে লক্ষ করে হয় তার এদিনের অভিযাত্রা তাহলে তো আমার খবর আছে। কিন্তু আমি কেন? দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খেতে খেতেই একসময় টুক করে ট্রেন থেকে নেমে গেলাম। আপনাদেরকে কানে কানে বলে রাখি, ট্রেন পাল্টানোর জন্য আমার যেখানে নামা দরকার সেখানেই নেমেছি। কিন্তু মাথায় চিন্তা রয়েই গেছে। মেয়েদের জন্য নিউইয়র্কে কাজের অভাব নেই, তাহলে একটি মেয়ের এই অবস্থা হবে কেন? হ্যাঁ, যদি এটাই তার দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়া হয়, তাহলে তো এতে অবশ্যই চিন্তিত হবার বিষয় আছে। আপনারা কি বলেন?

লেখা আর বেশি লম্বা করবো না। আরেকটা ছোট্ট বিষয়ের উল্লেখ করেই আজকের লেখার টানবো ইতিরেখা। আপনারা জ্যাকসন হাইটের কাবাব কিং-এর কর্নারে একটা কাগজের ঠোঙ্গা হাতে বসে থাকা এক নারীকে ভিক্ষা করতে দেখে থাকেন। তিনি সালাম দেন এবং হিন্দি অথবা উর্দুতে আবেদন করেন ওনাকে একটি ডলার প্রদানের জন্য। প্রিয় পাঠক হয়তো বলবেন, হ্যাঁ দেখেছি তো, কিন্তু এতে আবার লিখবার মতো এমন কি ঘটলো? তাতো বটেই, পৃথিবীতে কতো শত-সহস্র মানুষই তো ভিক্ষা করে, তা আবার লিখতে হবে কেন? লেখার অনেক কিছুই তো আছে? প্রশ্ন হলো: পৃথিবীতে কি ধন-সম্পদের অভাব আছে, মানুষকে ভিক্ষা করতে হবে কেন? এই কেন প্রশ্নটি ধনী দেশে আরো বড় হয়ে দেখা দেয়। তবে আমরা আজ সে কারণে লিখছি না, আমরা লিখছি অন্য কারণে। এদিন কাবাব কিং-এর এদিক থেকে আপনা বাজারের সামনে গিয়ে দেখি, এনার মতো আরো দু’জন বিশ-ত্রিশ হাত ব্যবধানে ওয়াকওয়েতে বসে আগে উল্লিখিত ওই নারীর মতোই ভিক্ষা করছেন। দেখতে একই রকম মনে হলো, হাতে একই রকম কাগজের ঠোঙ্গা, কণ্ঠে একই রকম বিনয়ী সালাম! আমি কি ঠিক দেখেছিলাম? আমি কি ঠিক ছিলাম? আসলে হচ্ছেটা কি? বলা হয়, তথাকথিত সমাজতন্ত্র অক্ষমকে উত্তেজিত করে তুলে তাদের দ্বারা সক্ষমকেও অক্ষমের স্তরে নিয়ে আসে আর ধনতান্ত্রিক সমাজ ক্রমশ নিম্নবিত্তকে মধ্যবিত্তে এবং মধ্যবিত্তকে উচ্চবিত্ত স্তরে নিয়ে আসে। তাহলে একজন ভিক্ষাজীবী নারী কি করে তিনজন হয়ে গেলেন?

প্রিয় পাঠক হয়তো বলবেন, লেখক সাহেব, এতোক্ষণ দেখলাম আপনি আপন নিরাপত্তার চিন্তায় ভারাক্রান্ত, কিন্তু এখন দেখি সমাজচিন্তার মতো বড় বড় কথা বলছেন! অবাক কাণ্ড বটে। কিন্তু প্রিয় পাঠক, আমাকে একটু আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিন। লেখালেখি কাজটা কিন্তু অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন মিশিয়ে পানি বানানোর মতো বিষয় নয়। এটি আরো অনেক জটিল। বর্তমান বিশ্বে সত্য কথাটি লিখতে চাওয়া আরো রিস্কি। কারণ সত্যের মধ্যে মাত্র দুই রকম গ্যাস নয়, বিশ্বের তাবৎ গ্যাস এতে থাকে- লেখাতে এসে যায় জীবনের অগণিত বিষয়সমূহ। তাই নয় কি? সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, আমাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। সবার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আমার জন্য দোয়া করবেন।

শেয়ার করুন