০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বুধবার, ০৬:০৬:৪০ অপরাহ্ন


জামায়াত-এনসিপি জোটের লাভ যাবে কার ঘরে
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০২-২০২৬
জামায়াত-এনসিপি জোটের লাভ যাবে কার ঘরে জামায়াত ইসলামী ও এনসিপির লগো


জামায়াতে ইসলামীর সাথে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র জোট গঠন নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা চলছে-ই। এই জোটের অন্যতম শরিক এনসিপি নিয়ে-ও আলোচনা জোরেসোরে চলছে। দেখা দিয়েছে নানান বির্তক। জামায়াতের সাথে এনসিপির জোট গঠনের নেপথ্যে কি? তাদের লক্ষ্য-বা কি? তারা কাদের আদর্শ বাস্তবায়ন করবে? না-কি তারা আসলে জুলাই বিপ্লবীদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করবে না? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এই জোট সম্পর্কে করা একটি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করছে। জামায়াতে ইসলামীর জোট ছেড়ে দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। কারো কারো মতে, এমন পরিস্থিতির অবতারণা করা হয়েছে যেনো এমনি থেকেই ইসলামী আন্দোলন জোট ছেড়ে চলে যায়। এগুলো নিয়ে এখন ভোটের মাঠে তুলকালাম। কেনোনা সব ইসলামী দলমতকে এক মঞ্চে এসে এক বাক্সে ভোট আনার প্রক্রিয়া কেনো ভেস্তে গেলো তা নিয়ে চলছে চুলচেরা হিসাব। তবে এর মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে এনসিপির সাথে জামায়াতের এতো ঘনিষ্ঠতার পেছনে কি?

যতোই ভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে ততই জামায়াতের বিরুদ্ধে দলটির অতীত কর্মকান্ডে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নটি চলে আসছে। কারো কারো মতে, এবিষয়টি জামায়াত আগেভাগেই হিসাব কষে নিয়ে জুলাই বিপ্লবের আর্দশের ছাত্রদের ইমেজে গড়া দলটিকে নানান ধরনের সুবিধার কথা বলে কাছে টেনে নিয়েছে। তা মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জুলাই বিপ্লবীদের ইমেজে গড়া এনসিপিকে বোঝানো হয়েছে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারলে কোনোভাবেই জুলাই সনদসহ এর সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলির তারা পাত্তাই দেবে না। একারণে এনসিপি জামায়াতকে সহজেই বিশ্বাস করে নেয়। আরেকটি কারণ ছিল এনসিপিকে বোঝানো হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক কারণে সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ যেকোনোভাবে আবার ক্ষমতায় সরাসরি চলে না আসলেও খুব দ্রুতই মাঠে বিস্তর প্রভাব বিস্তার করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে ২৪ এর জুলাই বিপ্লবে অংশ নেওয়া এনসিপি নেতারা ছাড়া-ও অন্যরা যারা ওই আন্দোলন শরিক হয়েছিল তারা আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রোষাণলে পড়বে। আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক সামাজিক ভবিষ্য দুর্বিসহ করে তুলবে। সেক্ষেত্রে মাঠে এনসিপি বা জুলাই বিপ্লবীদের পাশে জামায়াতই থাকবে না বলে তাদের বোঝানো হয়। অন্যদিকে জামায়াত এনসিপির তরুণ নেতাদের আরও কয়েকটি বিষয়ে আশ্বস্ত করে। তারা বোঝায় যে তাদের দল কোনোভাবেই প্রধান বিরোধী দল দূরে থাক, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো আসন-ই পাবে না জামায়াত পাশে না থাকলে। একারণে এনসিপি দ্রুত জামায়াতের সাথে ঐক্য করে ফেলে। 

জামায়াত-এনসিপি জোট লাভ কার?

তবে জামায়াত এনসিপিকে ১০ দলীয় জোটে এনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভাগেই তাদের রাজনৈতিক লাভ সুকৌশলে ইতোমধ্যেই ঘরে তুলে নিয়ে নিয়েছে বলে কারো ধারণা। এনসিপিকে কাছে পেয়ে ইসলামী আন্দোলনের মতো একটি দলকে দাবিয়ে রাখার একটি বড়ো ধরনের সুযোগ পায়। এতে করে ইসলামী আন্দোলন জামায়াত থেকে বেশি আসন দাবি পুরণ না করতে পেরে জোট সহজেই ত্যাগ করার পথটি পেয়ে যায়। এতে পক্ষান্তরে জামায়াতের-ই লাভ হয়। অনেকের মনে করে বিশাল একটি ইসলামী জোট হচ্ছে আওয়াজ তুলে জুলাই বিপ্লবীদের দল এনসিপিকে কাছে নিতে জামায়াত বড়ো ধরনের সুযোগ পেয়ে যায়। একটি সূত্র জানায়, জামায়াত আসলেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে ইমান আকিদা আদর্শগত অনেক প্রশ্নে কখনোই এক থাকতে পারতো না, ভবিষ্যতেও পারবে না। অন্যদিকে পশ্চিমারা জামায়াতের নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি ইসলামী জোট বা ঐক্য কোনোভাবেই গ্রহণ করতে নারাজ। যা জামায়াত পশ্চিমা কূটনীতিকদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে আঁচ করে ফেলে বা চাপে পড়ে যায়। কারো মতে, সম্প্রতি যে কোনো একটি কারণে ইতোমধ্যে জামায়াত পশ্চিমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। অন্যদিকে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন এক মঞ্চে চলে আসাকে পশ্চিমাদের পাাশাপাশি একটি প্রতিবেশি দেশও চায়নি। জামায়াত তা-ই ইসলামী আন্দোলন জোট ছেড়ে চলে যাওয়ায় কোনো আফসোসও করতে দেখা যায়নি, বা যাচ্ছে না। 

এনসিপি’র লাভের ঘরে কি?

তা-ই অনেকর প্রশ্ন জামায়াতের কাছাকাছি এনসিপি কি আসলে কি পেলো? এনসিপি যে আসলে কিছুই পায়নে বা পেতে যাচ্ছে না ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একটি বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। ভারতের দ্য উইকের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম বলেছেন, কেন নির্বাচনে লড়ছেন না বা এনসিপিতে যোগ দেননি, সেই প্রশ্নে মাহফুজ আলম জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার জোটটি কোনো সঠিক বোঝাপড়া ছাড়াই গঠিত হয়েছে। তার এই বক্তব্য বোঝা যায় ২৪ জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে গড়ে উঠা দলটি আসলে জামায়াতের সাথে কারণে ঐক্য করেছে বা এমন ঐক্যকে কতদুর তা স্পস্ট নয়। কারণ বোঝাপড়া যে হয়নি তা মাহফুজ আলম ঠিকই ধরতে পেরেছেন। 

জামায়াত কি লক্ষ্য পুরণে সফল হবে

জামায়াতে ইসলামী একটি ক্যাডারভিত্তিক দল। এই দলটি বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিকে কি কি করণীয় তা-র ছক হাতে নিয়েই এগিয়েছে। সেক্ষেত্রে এনসিপি এদের কৌশলের কাছে কিছই না। তবে ইসলামী আন্দোলনসহ আর কয়েকটি দলকে নিয়ে ইসলামী ভোট এক বাক্সে আনার যে আওয়াজ নিয়ে এগিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ঝাঁকুনি দিতে পেরেছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন। যা একটি বড়ো দল হিসাবে বিএনপিকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু বড়ো ধরনের ঝাঁকুনি দিয়ে সরে পড়ায় জামায়াতের বিরুদ্ধে দিন দিন অপরাপর ইসলামী দল ও মতের একটি বিরাট অংশকে হতাশ করে ফেলেছে। আর সে-ই হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মন্তব্য অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট কি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যবিহীন? আবার অনেক রকম প্রশ্ন উঠছে যখন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেই যাচ্ছে যে, ‘জামায়াতে ইসলামী ইসলামের নামে মিথ্যাচার করছে। মুখে ইসলামের কথা বললেও বাস্তবে তারা শরিয়াহ আইন অনুযায়ী দেশ চালাতে চায় না। প্রচলিত আইনে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি তারা আমেরিকা ও ভারতের গোলামি করতে চায়।’ কিংবা যখন তিনি বলেন, ‘জামায়াতের মুখে এক কথা, অন্তরে অন্যটা। দ্বিচারিতা আচরণ কোনো ইসলামী দলের হতে পারে না। জনগণ এসব ভাঁওতাবাজির রাজনীতি দেখতে চায় না। ইসলাম নিয়ে জামায়াতের এসব তামাশা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বরদাস্ত করবে না’। এমন বক্তব্যে পরিপ্রেক্ষিতে বড়ো ধরনের প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে এনসিপি না-হয় জামায়াতের সাথে জোট করে তেমন সুবিধা করতে পারছে না বা ব্যর্থ হবে। কিন্তু অন্যদিকে জামায়াত কি পারবে ইসলামী আন্দোলনের এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিজেদের মতকে জোর গলায় প্রতিষ্ঠা করতে? পারবে বিএনপিকে কে জুলাই সনদের বিরুদ্ধে দল হিসাবে প্রচার করে তরুণ প্রজন্মের ভোট বাক্স পুরণ করতে? কেননা ইতোমধ্যে বিএনপি জুলাই সনদ চায় না বা তারা ক্ষমতায় গেলে জুলাই স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ মানবে-ই না না বলে বিভিন্নভাবে প্রচার করে যাচ্ছে। যার জবাব-ও দিতে হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে এই বলে যে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের পক্ষে আছে বিএনপি। ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে যে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে তা আমরা অক্ষরে অক্ষরে প্রত্যেকটি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করব। জুলাই সনদের বাইরে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তা-ই অনেকের প্রশ্ন এনসিপি সাথে সাথে জামায়াতের লক্ষ্যহীন ঐক্য নিয়ে ইসলামী ভোট এক বাক্সে আনার কথা বলে তা-র থেকে সরে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া নির্বাচনী মাঠ সামলাতে পারবে কি দলটি?

শেয়ার করুন