১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, ০৫:৫৩:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীদের জন্য ফ্রি শাটল সার্ভিস চালু করল বেবিচক অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত নিউইয়র্কে ১ হাজার ২৫০ কিউনি শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে অমনি কার্ড পাইলট কর্মসূচি মসজিদে ইসলামবিরোধী ও প্রাণনাশের হুমকিতে এক ব্যক্তি অভিযুক্ত সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর উদযাপনে ধর্মীয় ইতিহাস ঘিরে বিতর্ক দুর্বৃত্তের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নর্থ ইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার ওজনপার্কের বৈঠকখানা রেস্টুরেন্টে হাতবোমা নিক্ষেপ নিউইয়র্কে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী


আমেরিকার অর্থনীতিতে সতর্ক সংকেত
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২৬
আমেরিকার অর্থনীতিতে সতর্ক সংকেত আমেরিকার অর্থনীতিতে সতর্ক সংকেত


যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রচেষ্টা, উচ্চ সুদের হার, ধীর হয়ে আসা কর্মসংস্থান বাজার এবং আবাসন খাতের চাপসহ সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস দেশটির অর্থনৈতিক গতিপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সপ্তাহের প্রকাশিত ও আসন্ন অর্থনৈতিক তথ্য, বিশেষ করে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই ), কর্মসংস্থান রিপোর্ট এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতি, ২০২৬ সালের বাকি সময়ের অর্থনীতির দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

সর্বশেষ শ্রমবাজারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাকরি সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। জুন মাসে দেশটিতে মাত্র প্রায় ৫৭ হাজার নতুন চাকরি যোগ হয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। একই সময়ে বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশে অবস্থান করছে। যদিও এই হার ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাকরির বাজারের প্রকৃত শক্তি বোঝার জন্য শুধু বেকারত্বের হার যথেষ্ট নয়। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমে গেলে বেকারত্বের হার কৃত্রিমভাবে কম দেখাতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার এখনো বড় ধরনের সংকটে পড়েনি, তবে নিয়োগের গতি ধীর হয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং অনেক ছোট ব্যবসা উচ্চ ঋণের খরচ, মজুরি বৃদ্ধি ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা ও কিছু পেশাগত খাতে চাকরি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও আতিথেয়তা, খুচরা ও কিছু সেবা খাতে নিয়োগের গতি কমেছে।

এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডারেল রিজার্ভের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) এখনো ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন, আগামী সিপিআই প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে জ্বালানি মূল্য, আমদানি ব্যয়, শুল্ক বৃদ্ধি এবং আবাসন খরচের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি।

জুন মাসের সিপিআই নিয়ে বাজারে বিভিন্ন পূর্বাভাস রয়েছে। বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমার পথে থাকলেও তা এখনো ফেডের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি থাকবে। তবে কিছু অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন, যদি আমদানি খরচ, পণ্যের দাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। কিছু উচ্চ ঝুঁকির পূর্বাভাসে সিপিআই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।

ভোক্তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। নিউইয়র্ক ফেডের জরিপ অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়ে ৩.৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম উচ্চ পর্যায়। তিন বছরের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা প্রায় ৩.৩ শতাংশ, আর পাঁচ বছরের প্রত্যাশা প্রায় ৩ শতাংশে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়লে তারা ব্যয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে।

ফেডারেল রিজার্ভ বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করছে। দুর্বল কর্মসংস্থান তথ্য সুদের হার কমানোর পক্ষে যুক্তি তৈরি করলেও মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি থাকায় ফেড কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বর্তমানে ফেডের নীতিগত সুদের হার প্রায় ৩.৫০ শতাংশ থেকে ৩.৭৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। ফেড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুদের হার কমানোর আগে তারা নিশ্চিত হতে চান যে মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে নিচের দিকে যাচ্ছে।

ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সিপিআই রিপোর্ট এবং শ্রমবাজারের তথ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি মূল্যস্ফীতি কমতে থাকে এবং চাকরির বাজার দুর্বল হয়, তাহলে ফেড বছরের শেষ দিকে সুদের হার কমানোর সুযোগ পেতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে গেলে সুদের হার দীর্ঘ সময় বর্তমান উচ্চ পর্যায়ে রাখা হতে পারে।

উচ্চ সুদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজারে। ৩০ বছরের ফিক্সড মর্টগেজ সুদের হার এখনো প্রায় ৬ শতাংশের ওপরে থাকায় অনেক আমেরিকান বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। উচ্চ মাসিক মর্টগেজ পেমেন্ট, বাড়ির দাম বৃদ্ধি এবং সীমিত সরবরাহের কারণে প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে চাওয়া পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে।

আবাসন বাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাড়ির মালিকদের আচরণ। অনেক বাড়ির মালিক ২০২০ ও ২০২১ সালের কম সুদের মর্টগেজ ধরে রেখেছেন এবং নতুন উচ্চ সুদের ঋণে যেতে চাইছেন না। এর ফলে বাজারে বাড়ির সরবরাহ কম রয়েছে এবং অনেক এলাকায় দাম এখনো সাধারণ পরিবারের আয়ের তুলনায় বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ফেড যদি ভবিষ্যতে সুদের হার কমায়, তাহলে মর্টগেজ রেট কমতে পারে এবং আবাসন বাজারে কিছুটা গতি ফিরতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে দ্রুত সুদ কমার সম্ভাবনা সীমিত থাকবে।ভোক্তা ব্যয়ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশটির মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু খাদ্য, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার তাদের দৈনন্দিন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তা ব্যয় দুর্বল হয়ে গেলে ব্যবসার আয় কমতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি আরও ধীর হতে পারে। তবে বর্তমানে ভোক্তা ব্যয় পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে এখনো কিছুটা সমর্থন দিচ্ছে।অভিবাসন নীতি এবং শ্রম সরবরাহও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষি, নির্মাণ, রেস্টুরেন্ট, আতিথেয়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে অভিবাসী শ্রমিকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সতর্ক করছেন, শ্রমিক সরবরাহ কমে গেলে কিছু খাতে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যেতে পারে।

২০২৬ সালের বাকি সময়ের জন্য অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস মিশ্র। ইতিবাচক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমে গেলে ফেড সুদের হার কমাতে পারে, যার ফলে আবাসন বাজার, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং ভোক্তা আস্থায় উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে গেলে সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে মূল্যস্ফীতির গতি, কর্মসংস্থান বাজারের শক্তি এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার মধ্যে না থাকলেও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট এবং ধীর চাকরি বৃদ্ধির কারণে সাধারণ আমেরিকান পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।

শেয়ার করুন