তুষার পরিষ্কারের দৃশ্য
তীব্র শীত ও তুষারঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাতে চাপা পড়েছে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি। বাতিল করা হয়েছে হাজার হাজার ফ্লাইট। বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ৮ লাখের বেশি সেবাগ্রহীতা। এ দুর্যোগ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অন্তত ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির অন্তত ২৫টি অঙ্গরাজ্যে আবহাওয়া-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। প্রচন্ড তুষারঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে জনজীবন। তুষারঝড়ের দিন অনেকেই বাসায় বন্দী ছিলেন। নেহাত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া কেউ বাইরে বের হননি। বাইরে যাওয়ার মত পরিস্থিতিও ছিল না।
গত ২৫ জানুয়ারি রাতেও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চরম আবহাওয়ার দাপট অব্যাহত ছিল। টেক্সাসে প্রতিকূল আবহাওয়ার উন্মাদনা দেখা গেছে। আর ন্যাশভিল থেকে ন্যান্টাকেট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় লাখো মানুষ তুষারঝড়ে বিপর্যস্ত। কোথাও কোথাও ২৪ থেকে ২৫ ইঞ্চি পুরুত্বের তুষারপাত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এতে মারা গেছেন ১৯ জন। এর মধ্যে নিউইয়র্কেই মারা গেছে ৭ জন। টেনেসি, লুইজিয়ানা, টেক্সাস, ম্যাসাচুসেটস ও ক্যানসাসে মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। তুষারঝড়ের কারণে বন্ধ হয়েছে প্রায় হাজার হাজার ফ্লাইট। এতে বলা হয়, ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (এনডব্লিউএস) প্রেডিকশন সেন্টার জানিয়েছে, ২৫ জানুয়ারি সকাল ৬টা থেকে তুষারপাত শুরু হয়, যা শেষ হয় রাত ১২টায়। সূত্র জানায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কমপক্ষে ২৪ ইঞ্চি তুষারপাত হয়েছে। এরপর দক্ষিণাঞ্চলে নামবে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও বরফাচ্ছন্ন পরিস্থিতি। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সামনে রয়েছে ‘বিপর্যয়কর বরফঝড়’। নিউ ইয়র্ক স্টেট ডিভিশন অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস জানিয়েছে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি রোববার দুপুর ১২টা থেকে সোমবার মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত।
ইতিমধ্যেই ঝড়টি টেক্সাসের হ্রদগুলোতে টর্নেডোর মতো দেখতে ঘূর্ণি ভর্টেক্স তৈরি করেছে এবং ম্যাসাচুসেটসে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ৩৫ মাইলের বেশি গতির বাতাস ও এক-চতুর্থাংশ মাইলেরও কম দৃশ্যমানতা নিয়ে তুষারঝড় দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় সারা দেশে স্কুল ও সরকারি দফতর সোমবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যদিও ৬ শ্রেণী থেকে ৮ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অনলাইন ক্লাস নেওয়া হয়েছে।
টেক্সাসে ‘স্টিমনেডো’ রেকর্ড করা হয়েছে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, উষ্ণ হ্রদের পানির ওপর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেলে এই ধরনের বাষ্পীয় ঘূর্ণি তৈরি হয়।
ডেল্টা এয়ারলাইনস জানিয়েছে, যেখানে নিরাপদ, সেখানে তারা ফ্লাইট পুনরায় চালু করছে। তবে আটলান্টায় তীব্র শীত এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চলমান ঝড়ের কারণে সোমবারও ফ্লাইট ব ন্ধরাখা হয়। এনবিসি নিউজ জানায়, সাউদার্ন প্লেইনস থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত প্রায় ১৩৬ মিলিয়ন মানুষ শীতের সতর্কতার আওতায় থাকবে। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত কম থাকতে পারে। ডালাস, হিউস্টন, অস্টিন, নিউ অরলিন্স, লিটল রক ও তুলসায় রেকর্ড নিম্ন তাপমাত্রা দেখা দিয়েছে। আলাবামা, জর্জিয়া ও ফ্লোরিডার কিছু অংশে টর্নেডো সতর্কতা জারি রয়েছে।
ম্যাসাচুসেটসে একটি স্নোপ্লাউ ট্রাকের ধাক্কায় ৫১ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন। রোববার দুপুরে নরউড সেন্ট্রাল স্টেশনের পার্কিং লটে হাঁটার সময় ট্রাকটি পেছনে নেওয়ার সময় দম্পতিকে ধাক্কা দেয়। স্বামী (৪৭) গুরুতর নন এমন আঘাতে হাসপাতালে ভর্তি। ঘটনাটি তদন্তাধীন। অন্টারিও প্রভিন্সিয়াল পুলিশ জানিয়েছে, হাইওয়ে সেফটি ডিভিশন ১৫০টি দুর্ঘটনা ও ১২৫টি গাড়ি খাদ্য/বরফে আটকে পড়ার ঘটনায় সহায়তা দিয়েছে। পুলিশ জনগণকে ঘরে থাকতে ও ঝড় কেটে যাওয়ার অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেছে। কানসাসে নিখোঁজের পর এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৮ বছর বয়সী শিক্ষিকার মরদেহ তুষারের মধ্যে পাওয়া গেছে। পুলিশ ধারণা করছে, তিনি হাইপোথার্মিয়ায় মারা গেছেন। আবহাওয়াবিদরা নিশ্চিত করেছেন, ম্যাসাচুসেটসের ন্যান্টাকেটে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কমপক্ষে ৩৫ মাইল বেগের বাতাস ও অতি কম দৃশ্যমানতার কারণে ব্লিজার্ড পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। টেক্সাসের অস্টিনে একজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
শীতের এ তীব্রতা ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিউইয়র্ক ও ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্য থেকে দক্ষিণের টেক্সাস ও নর্থ ক্যারোলাইনা পর্যন্ত। এসব অঞ্চলে ১৮ থেকে ২৪ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষারপাত হয়েছে। তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। তুষারঝড়ের কবলে পড়েছেন ১১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে ১৫ কোটির বেশি মানুষকে।
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে। সেখানে সাতজন মারা গেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোচুল নিউইয়র্ক শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন। শহরের কোনো বাসিন্দার সাহায্য প্রয়োজন হলে জানাতে বলেছেন মেয়র জোহরান মামদানি। টেনেসি, লুইজিয়ানা, টেক্সাস, ম্যাসাচুসেটস ও কানসাস থেকেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তুষারঝড়ের কারণে গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১১ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছিল। ২৬ জানুয়ারি এ সংখ্যা আরো বেড়েছে। এছাড়া গত ২৬ জানুয়ারি স্থানীয় সময় ভোর চারটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলেন টেক্সাস থেকে ভার্জিনিয়া পর্যন্ত ৮ লাখ ২০ হাজারের বেশি গ্রাহক।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তুষারঝড়ের বলয়টি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে সরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে একই সঙ্গে এ অঞ্চলে আর্কটিক থেকে আর বায়ু প্রবেশ করতে পারে। ফলে এদিন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরো ভারী তুষারপাত ও বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে তীব্র শীত আরো কয়েক দিন থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
নিউইয়র্কের অধিবাসীরা নিজেরা তাদের বাড়ির সামনে পরিষ্কার করে। অন্যদিকে সিটির সিনিটেশন বিভাগ সার সিটিতে স্নো পরিষ্কার করে। এখনো পর্যন্ত রাস্তা পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে হাই রোডগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। স্নো শেষ হলেও তার রেশ এখনো কাটেনি। তুষারঝড়ের পর প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকার কারণে রাস্তায় রাখা গাড়িগুলো বের করার চেষ্টা করছেন। সোজা কথা হলো- এই তুষারঝড়ে জনজীবন লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরে নিউইয়র্কবাসী এই ধরনের তুষারঝড় দেখেননি।