জাতীয় স্মৃতিসৌধে জামায়াত নেতৃবৃন্দের সাথে এনসিপি নেতারা
জুলাই বিপ্লবীদের ইমেজকে ধারণ করার প্রতিশ্রতি দিয়ে গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি বড়ো অংশ আর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চায় না। জামায়াতের অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন ধরনের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে এনসিপিতে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ-ছাড়া ভবিষ্যতে ভূ-রাজনৈতিক নানান হিসাব নিকাশেও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে এনসিপি বিপদে পড়ারও আশঙ্কা থেকে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করতে চায়।
সম্প্রতি কয়েকটি ইঙ্গিত
জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছিল। এই সমঝোতায় কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও (এলডিপি) যুক্ত হয়। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের ফল ঘোষণায় দেখা যায় যে, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন অন্যদিকে এনসিপি ৬টি পেয়েছে। তবে ওই নির্বাচনে সমঝোতায় একসময়ে জামায়াতের রাজনীতির তুমুল বিরোধীকারী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ছিটকে পড়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াত-এনসিপির জোটের প্রচার প্রচারণায় মনে হয়েছিল তারা ক্ষমতার আসীন হয়ে যাচ্ছে কিংবা বড়ো ধরনের ব্যবধানে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। বলা হতো যে এনসিপির আহ্বায়ক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আগামীর প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। এমন মন্তব্য অবশ্য করেছিলেন দলটির আরেক রাজনৈতিক সহকর্মী হাসনাত আব্দুল্লাহ্। কারো কারো মতে, জমায়াতের পক্ষ থেকে এদেরকে জোটে ধরে রাখতে এমন প্রচারণা কৌশলে চালায়। কিন্তু শেষমেষ এনসিপির এই আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মনোনীত হয়েছেন। তবে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনা অন্যরকম ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর একটি হলো এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই মাহফিলে উপস্থিতি। শুধু উপস্থিতিকেই হিসাবে নিচ্ছেন না অনেকে। কেননা এখানে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কিছু কথা বলেছেন যা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি স্বীকার করেন নেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে ব্যানার নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আসিফ বলেন, এই অবদান দেশ ও জাতির জন্য আমরা আজীবন স্মরণ করবে এবং তারাও করবে। এসময় আসিফ মাহমুদ বলেন, এখন আমি জীবিত অবস্থায় আপনাদের সামনে রয়েছি সেটা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সে সময় আমাদের পাশে যারা এসে দাঁড়িয়েছিল তাদের জন্য সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে রাজপথে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আগামীতেও সেই সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি বেশ ইঙ্গিত বহণ করে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
এনিসিপিরি ভেতরেও টানাপোড়েন
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে এনসিপি আর কত দিন থাকবে, এমন ধরনের প্রশ্ন উঠেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠত দলটির সাধারণ সভায়। দলের ভেতর থেকে একটি শক্তিশালি অংশ থেকে এই প্রশ্নের জবাবে কোনো স্বচ্ছ জবাব দিতে দেখা যায়নি শীর্ষ পর্যায় থেকে। সভা উপস্থিত থাকা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন এই ব্যাপারে পরিস্কার ধারণা দেননি। ওই সভায় জানতে চাওয়া হয় জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী ঐক্য আর কত দিন থাকবে? জানা গেছে ওই সভায় জামায়াতের বিরুদ্ধে জোটের বিরুদ্ধে নানান ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন তোলা হয় একটি বড়ো অংশ থেকে। অবশ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যখন এই জোট নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন-ও অনেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন যে এই জোটে গেলে তাঁরা নির্বাচন করবেন না এবং এই জোটের বিরুদ্ধে বলবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে শীর্ষ নেতত্বের কড়া জবাব ছিলো তাঁরা কী করবেন, এটি তাঁদের ইচ্ছা। তবে তাদের অতীত নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সে-ই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি যোগ দেওয়ার দলে অন্যরকম অবস্থার তৈরি হয়। কারণে জুলাই বিপ্লবে অংশ নেওয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নারীরা এনসিপিকে জামায়াতের বি-টিম বলে দূরে সরে যায়। এসব বিষয়গুলো নিয়ে এখন দলের চরম টানাপোড়েন চলছে।
সংসদে
এদিকে জাতীয় সংসদেও ২০২৪ সালের ২৪ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ইমেজে গড়া এনসিপির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় সংসদে গিয়ে দলটি জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়েছে কি-না সে-প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপি’র অনেকেই মনে করে এনসিপি আসলেই জামায়াতের সহযোগী বা বি টিম। এমনই বক্তব্য আসে যখন বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ সংসদে এনসিপিকে ’জামায়াত জেনারেশন’ না হয়ে জেন-জিকে প্রতিনিধিত্ব করার আহ্বান জানান। এনসিপিকে ‘জামায়াত জেনারেশন’ না হওয়ার ব্যাপারে পার্থের পরামর্শ দলের মধ্যে বেশ প্রতিক্রিয়া ফেলে।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে এনসিপির অবস্থান
এদিকে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে সকালের দিকে সৌধের বেদিতে এসে শ্রদ্ধা ও মোনাজাত অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন দৃশ্য দেখে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী সেইসব জেন-জির বা জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধারা অনেক ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কেননা ওইদিন স্মৃতিসৌধে দেখা গেলো জামায়াত নেতারা কিভাবে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামকে পেছনে দাঁড় করিয়ে শ্রদ্ধা ও মোনাজাত পরিচালনা করেছেন। এবিষয়গুলোও এনসিপিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। অনেকে ওই দৃশ্য দেশে মনে করেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে নাহিদরা জামায়াতের নেতার কাছে তুচ্ছই রয়ে গেছে।
ভারত প্রশ্নে নানান ধোয়াশা তো আছেই
এদিকে এনসিপি নেতারা মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি মুখে ভারত বিরোধীতার কথা বললেও গোপনে দেশটির সাথে অন্যধরনের সম্পর্ক ঠিকই বজায় রাখছে কিংবা গোপন সমঝোতায় আছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে আগে ভারতের সাথে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকের খবরের বেশ কয়েকটি তথ্যপ্রমাণ এনসিপি নেতাদের মধ্যে বিষ্ময়ের সৃষ্টি করেছে। সবেচেয়ে বড়ো বিষয় ছিল তথ্য গোপন করে রাখার বিষয়টি। জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ২০২৫ সালে তাঁর বাইপাস সার্জারির পর ভারতের একজন কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু জামায়াতের আমির রয়টার্সকে বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকেরা যেমন প্রকাশ্যে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন, ভারতীয় কূটনীতিক তেমনটি করেননি। ভারতীয় ওই কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখতে বলেছিলেন।
শেষ কথা
দলের ভেতরে বাইরে এনসিপি এখন ইমেজ সঙ্কটে আছে। ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের ডাকে এই এনসিপির তৎকালীন ছাত্রনেতাদের ব্যাপারে ওই সময়ে কোনো দল বা মত কিংবা আদর্শের রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন বলে মনে হয়নি। সবাই ধরে নিয়েছিলো এরা একটি অরাজনৈতিক নিরপেক্ষ প্লাটফরম থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন করে যাচ্ছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত একটি ছাত্র সংগঠন, যা পরবর্তীতে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই বিল্পবের মাধ্যমে ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতনে এই সংগঠন প্রধান ভূমিকা পালন করে। ওই সময়ে সবপক্ষই বিশ^াস করতো এটি মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এই কারণে এই ব্যানারে থাকা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্তদের সর্বস্তরের জনগণ মনে প্রাণে গ্রহণ করার পাশাপাশি এতে সংহতি প্রকাশ করে। কিন্তু সে-ই ইমেজকে ধারণ করে দল গঠন করে এইসব সাবেক ছাত্রনেতারা জামায়াতে ইসলামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নামবে এটা কারো কাম্য হচ্ছে না-এমনটা আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের অভিমত। এসব কারণে দলের চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এমনকি সামনের দিনে এনসিপির পক্ষ থেকে যে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে সেখানেও জামায়াতের সাথে কোনোভাবেই যেনো জোট না করা হয় সে মতামতও জানানো হয়েছে। এখন সামনের দিনে দেখা যাবে এনসিপি কারো বি-টীম না নিজেদের স্ব-কয়িতা বজায় রাখার পথে হাঁটবে কি-না..।